Ad space

বিশ্বকাপের মহাকাব্যে শাকিরা: ফুটবল ও গ্ল্যামারের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়

প্রকাশ:
6
Image

ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, এটি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের আবেগ, উন্মাদনা এবং সংস্কৃতির এক মহা-উৎসব। আর এই উৎসবের পারদ যখন চড়তে চড়তে চরম সীমায় পৌঁছায়, তখন তাতে বাড়তি রঙ, সুর আর মোহময়তা যোগ করে সংগীত। মাঠের ভেতরের ৯০ মিনিটের লড়াই যেমন দর্শকদের রোমাঞ্চিত করে, তেমনি মাঠের বাইরের সংগীত আর পারফরম্যান্স সেই রোমাঞ্চকে ছড়িয়ে দেয় বৈশ্বিক ক্যানভাসে। ফুটবল ও সংগীতের এই দীর্ঘ মেলবন্ধনে গত দুই দশকে যিনি নিজেকে এক অনন্য ও অবিচ্ছেদ্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তিনি কলম্বিয়ান পপ সম্রাজ্ঞী শাকিরা। লাতিন আমেরিকার এই সুরের জাদুকরী ফুটবল বিশ্বকাপের সবুজ ঘাসে সুরের যে মহাকাব্য রচনা করেছেন, তা ক্রীড়া ও বিনোদন জগতের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। শাকিরা ও ফুটবল বিশ্বকাপ আজ যেন একে অপরের পরিপূরক নাম।

বিশ্বকাপ ও থিম সংয়ের আদি ইতিহাস

ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে আনুষ্ঠানিকভাবে গানের সংযোজন শুরুরও বেশ কিছু পরে। ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে যখন প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়, তখন ফুটবলারদের বুটের আওয়াজ আর গ্যালারির করতালিতেই সীমাবদ্ধ ছিল মাঠের আবহ। তবে বিশ্বায়নের সাথে সাথে এই খেলার সাথে সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে ফিফা।

সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৬২ সালের চিলি বিশ্বকাপ থেকে প্রথমবার কোনো অফিসিয়াল গানকে টুর্নামেন্টের সাথে যুক্ত করা হয়। চিলির রক ব্যান্ড ‘লস রাম্বলস’ সে বছর পরিবেশন করে ‘এল রকে ডেল মুন্দিয়াল’

Image

দারুণ সাড়া ফেলেছিল।

পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে আনা হয় এক নতুন মাত্রা। সে বছর বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম অফিসিয়াল মাসকট ‘উইলি’ (একটি সিংহ)-কে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় এবং তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় গান ‘ওয়ার্ল্ড কাপ উইলি’। গানটি গেয়েছিলেন ঐতিহ্যবাহী ব্রিটিশ গায়ক লনি ডোনেগান। এই গানটির মাধ্যমেই মূলত বিশ্বকাপের প্রচার ও প্রসারে সংগীতের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব স্পষ্ট হতে শুরু করে। এরপর ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে ‘ফুটবল মেক্সিকো ৭০’ কিংবা ১৯৭৪ সালের পশ্চিম জার্মানি বিশ্বকাপে ‘ফুসবল ইস্ত আনসার লেবেন’-এর মতো গানগুলো ফুটবলার এবং দর্শক উভয়ের মাঝেই টুর্নামেন্টের আমেজ ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখে।

গ্লোবাল থিম সং এবং আধুনিক রূপান্তর

আশির দশক থেকে নব্বইয়ের দশকে এসে বিশ্বকাপের থিম সংয়ের ধরনে এক বিশাল পরিবর্তন আসে। গানগুলো কেবল আয়োজক দেশের ভাষা ও সংস্কৃতির গ-ি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক রূপ নিতে শুরু করে। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে ‘এ স্পেশাল কাইন্ড অফ হিরো’ গানটি স্টেডিয়ামের গ-ি পেরিয়ে বৈশ্বিক টেলিভিশন সম্প্রচারের কল্যাণে মানুষের ড্রয়িংরুমে পৌঁছে যায়। ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপের থিম সং ‘উনা স্তাতে ইতালিয়ানা’ (ঞড় ইব ঘঁসনবৎ ঙহব) গানটিকে আজও অনেক ফুটবলপ্রেমী ইতিহাসের অন্যতম আবেগঘন এবং সুরের দিক থেকে শ্রেষ্ঠ বিশ্বকাপ গান হিসেবে বিবেচনা করেন।

তবে বিশ্বকাপের থিম সং সত্যিকার অর্থে বিশ্বব্যাপী এক বিশাল পপ কালচার বা যুব-উন্মাদনায় রূপ নেয় ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে। পুয়ের্তো রিকান পপ তারকা রিকি মার্টিনের গাওয়া ‘দ্য কাপ অব লাইফ’ (লা কোপা দে লা ভিদা) গানটি পুরো পৃথিবীর সংগীত ও ক্রীড়ার ইতিহাস বদলে দেয়। স্প্যানিশ ও ইংরেজি ভাষার মিশ্রণে তৈরি এই দ্রুত লয়ের গানটি ফুটবল মাঠের উত্তেজনাকে শতগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। রিকি মার্টিনের সেই কোমর দোলানো নাচ আর ড্রামসের তালে ‘আলে, আলে, আলে’ ধ্বনি প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, একটি দুর্দান্ত সুর কীভাবে ভাষার দেয়াল ভেঙে পুরো বিশ্বের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলতে পারে। এই গানটিই মূলত ফুটবল মাঠে আধুনিক পপ গ্ল্যামার ও ড্যান্স মিউজিকের স্থায়ী দরজা খুলে দেয়।

Image

বিশ্বকাপের মঞ্চে শাকিরার রাজকীয় অভিষেক

রিকি মার্টিনের তৈরি করে যাওয়া সেই আধুনিক ও গ্ল্যামারাস পথ ধরেই ফুটবল বিশ্বকাপে প্রবেশ ঘটে কলম্বিয়ান পপ কুইন শাকিরার। ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে বিশ্ববাসী প্রথম আবিষ্কার করে যে, ফুটবলের উন্মাদনার সাথে শাকিরার শরীরী ভাষা এবং কণ্ঠের জাদু কতটা নিখুঁতভাবে মিশে যেতে পারে।

সে বছর জার্মানির বার্লিন অলিম্পিক স্টেডিয়ামে ইতালি ও ফ্রান্সের মধ্যকার ফাইনাল ম্যাচের সমাপনী অনুষ্ঠানে মঞ্চে ওঠেন শাকিরা। যদিও ২০০৬ সালের অফিশিয়াল থিম সং ছিল ইল দিভোর ‘টাইম অব আওয়ার লাইভস’, কিন্তু সমাপনী আসরে শাকিরার গাওয়া ‘হিপস ডোন্ট লাই-ব্যাম্বু সংস্করণ’ পুরো টুর্নামেন্টের সমস্ত আকর্ষণ নিজের দিকে কেড়ে নেয়।

লাল পোশাকে শাকিরার সেই মঞ্চ কাঁপানো পারফরম্যান্স এবং তাঁর বিখ্যাত বেলি ড্যান্স গ্যালারিতে উপস্থিত লাখো দর্শক এবং টিভির পর্দায় চোখ রাখা কোটি মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ‘ব্যাম্বু’ সংস্করণে লাতিন ট্রাম্পেটের সাথে আফ্রিকান ড্রামসের যে ফিউশন শাকিরা তৈরি করেছিলেন, তা বিশ্বকাপের আবহকে এক লহমায় বদলে দিয়েছিল। এই একটি মাত্র পারফরম্যান্সের মাধ্যমে শাকিরা ফিফা কর্মকর্তাদের এবং বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মনে এই বিশ্বাস গেঁথে দেন যে, ফুটবল বিশ্বকাপের গ্ল্যামারাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে পূর্ণতা দিতে তাঁর কোনো বিকল্প নেই।

‘ওয়াকা ওয়াকা’: ফুটবল ইতিহাসের অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ সংগীত

২০০৬ সালের সেই অভাবনীয় সাফল্যের পর, ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে ফিফা কোনো ঝুঁকি না নিয়ে সরাসরি শাকিরার কাঁধেই অফিশিয়াল থিম সং তৈরির মূল দায়িত্ব অর্পণ করে। আফ্রিকা মহাদেশে আয়োজিত প্রথম বিশ্বকাপের জন্য শাকিরা তৈরি করেন ‘ওয়াকা ওয়াকা (দিস টাইম ফর আফ্রিকা)’। এই গানটি কেবল একটি টুর্নামেন্টের গান হিসেবে থাকেনি, এটি পরিণত হয়েছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও অবিসংবাদিত অ্যান্থেমে।

গানটির সুরের পেছনে ছিল গভীর এক ইতিহাস। শাকিরা গানটির মূল সুর ও কোরাসটি নিয়েছিলেন আফ্রিকার ক্যামেরুনের একটি ঐতিহ্যবাহী সামরিক দলগত গান ‘জ্যাঙ্গালুয়া’ (তধহমধষবধি) থেকে, যা ১৯৮৬ সালে গোল্ডেন সাউন্ডস নামক একটি ব্যান্ড জনপ্রিয় করেছিল। শাকিরা এই আদি আফ্রিকান সুরের সাথে আধুনিক পপ, সিন্থ-পপ এবং লাতিন ছন্দের এমন এক অপূর্ব মিশ্রণ ঘটান, যা এক কথায় ছিল অসাধারণ। গানটির মাধ্যমে তিনি পুরো আফ্রিকান মহাদেশের শক্তি, সংগ্রাম এবং উদযাপনের চেতনাকে ফুটিয়ে তোলেন।

ভিউ, রিয়্যাকশন এবং ডিজিটাল দুনিয়ায় ঝড়

২০১০ সালের বিশ্বকাপের সেই উদ্বোধনী ও সমাপনী-উভয় মঞ্চেই শাকিরার ‘ওয়াকা ওয়াকা’ পরিবেশনা ছিল টুর্নামেন্টের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। রঙিন আফ্রিকান পোশাকে শাকিরার সেই উদ্যমী নাচ এবং গানের সিগনেচার স্টেপ বা হাতের মুদ্রা দ্রুতই বিশ্বজুড়ে এক মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে এই গানটি যে রেকর্ড গড়েছে, তা ক্রীড়া ও সংগীতের ইতিহাসে বিরল।

ইউটিউবে এই গানটির অফিসিয়াল ভিডিওর ভিউ ইতিমধ্যেই ৩.৯ বিলিয়ন (৩৯০ কোটি) ছাড়িয়ে ৪ বিলিয়নের ঘরের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা এটিকে ইতিহাসের অন্যতম সর্বাধিক দেখা মিউজিক ভিডিওর মর্যাদাদিয়েছে। শুধু ভিউ নয়, লাইক ও রিয়্যাকশনের দিক থেকেও গানটি এক অনন্য মাইলফলক। ইউটিউবে গানটিতে ২ কোটিরও বেশি লাইক বা পজিটিভ রিয়্যাকশন রয়েছে। টিকটক, ইনস্টাগ্রাম রিলস থেকে শুরু করে বিভিন্ন শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্মে ‘ওয়াকা ওয়াকা চ্যালেঞ্জ’ লিখে কোটি কোটি মানুষ নিজেদের রিয়্যাকশন ও নাচের ভিডিও আপলোড করেছে। বিশ্বজুড়ে সাধারণ ফুটবলপ্রেমী থেকে শুরু করে বড় বড় তারকারা এই গানের রিদমে মেতে উঠেছিলেন, যা এর বৈশ্বিক প্রভাবকে প্রমাণ করে।

শত কোটি ডলারের বাণিজ্য এবং আয়ের রেকর্ড

শাকিরার এই বিশ্বকাপ যাত্রা কেবল সংস্কৃতির দিক থেকেই সফল ছিল না, এটি ছিল বাণিজ্যিকভাবে একটি বিশাল সফল প্রজেক্ট। ‘ওয়াকা ওয়াকা’ গানটি বিশ্বব্যাপী ১৫টিরও বেশি দেশে বিলবোর্ড এবং মিউজিক চার্টের শীর্ষস্থান দখল করে। গানটির শারীরিক ও ডিজিটাল কপি বিক্রির সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় ১ কোটি ৫০ লাখের ওপর, যা এটিকে ইতিহাসের অন্যতম সর্বোচ্চ বিক্রিত সিঙ্গেল ট্র্যাকে পরিণত করে।

বিভিন্ন মিউজিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম (যেমন স্পটিফাই, অ্যাপল মিউজিক) এবং ইউটিউব থেকে এই গানটির রয়্যালটি ও স্ট্রিমিং বাবদ আয় হয়েছে কোটি কোটি ডলার। ডিজিটাল স্ট্রিমিং এবং লাইসেন্সিং ফি থেকে গানটি আনুমানিক ৫ কোটিরও বেশি মার্কিন ডলার আয় করেছে। শুধু তাই নয়, ২০১০ সালের বিশ্বকাপের সমাপনী অনুষ্ঠানের টিভি ও স্পনসরশিপ রেভিনিউ থেকে শাকিরা ও ফিফার যৌথ ব্র্যান্ড ভ্যালু এক ধাক্কায় শত কোটি ডলারের বাণিজ্যিক বাজারে রূপ নেয়। শাকিরার এই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ফিফা তাদের অফিসিয়াল মার্চেন্ডাইজ ও টিকিট বিক্রি থেকে ব্যাপক মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল।

সুরের মিউজিক ভিডিও ও জীবনসঙ্গী পিকের সাথে সাক্ষাৎ

‘ওয়াকা ওয়াকা’ গানটি শাকিরার পেশাদার জীবনে যেমন এক বিশাল মাইলফলক ছিল, তেমনি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও এটি নিয়ে আসে এক টার্নিং পয়েন্ট। গানটির অফিসিয়াল মিউজিক ভিডিওতে লিওনেল মেসি, দানি আলভেস, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মতো বিশ্বসেরা ফুটবলারদের পাশাপাশি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল স্পেনের তরুণ ও উদীয়মান ডিফেন্ডার জেরার্ড পিকে-কে।

এই মিউজিক ভিডিওর শুটিংয়ের সেটেই শাকিরার সাথে প্রথম দেখা হয় পিকের। পিকে পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছিলেন, শুটিংয়ের সময় শাকিরার রূপ এবং ব্যক্তিত্ব তাঁকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে, তিনি শাকিরাকে বলেছিলেন, স্পেনের হয়ে বিশ্বকাপ ফাইনাল জিতে তিনি আবার শাকিরার সাথে দেখা করতে চান (যেহেতু শাকিরা সমাপনী অনুষ্ঠানে গাইবেন)।

নিয়তির কী অপূর্ব লিখন, সে বছর জেরার্ড পিকের স্পেন দল ফাইনালে পৌঁছায় এবং নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি জয় করে। আর সেই ফাইনালের রাতে জোহানেসবার্গের মাঠে ট্রফি জয়ের উল্লাসের মাঝেই শাকিরা ও পিকের প্রেমের সম্পর্কের সূচনা ঘটে। ফুটবল এবং সংগীতের মেলবন্ধন কীভাবে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে বদলে দিতে পারে, শাকিরা ও পিকের এই গল্পটি তারই এক জীবন্ত উদাহরণ হয়ে থাকবে। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা তাঁদের এই সম্পর্ক ফুটবল এবং শোবিজ জগতের অন্যতম আলোচিত ও রোমান্টিক জুটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

‘লা লা লা’ এবং ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপের মোহময়তা

২০১০ সালের আকাশচুম্বী ও বিশ্ব কাঁপানো সাফল্যের পর, ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপেও শাকিরার ডাক পড়ে। যদিও সেই বছর ফিফার অফিসিয়াল থিম সং ছিল পিটবুল এবং জেনিফার লোপেজের ‘উই আর ওয়ান (ওলে ওলা)’, কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের মন পড়েছিল শাকিরার দিকেই। শাকিরা তাঁর নিজস্ব অ্যালবাম থেকে ‘ডেয়ার (লা লা লা)’ গানটিকে ব্রাজিল বিশ্বকাপের আবহ অনুযায়ী নতুন করে সাজিয়ে ‘লা লা লা (ব্রাজিল ২০১৪)’ নামে মুক্তি দেন।

ব্রাজিলীয় ড্রামের ছন্দ এবং কার্নিভালের আবহযুক্ত এই গানটি মুক্তির সাথে সাথেই অফিশিয়াল থিম সং-কে জনপ্রিয়তার দৌড়ে বহুদূরে পেছনে ফেলে দেয়। ইউটিউবে এই গানটির ভিউ ১.২ বিলিয়ন (১২০ কোটি) ছাড়িয়ে যায়, যা সেই বছরের অফিসিয়াল থিম সংয়ের চেয়েও অনেক বেশি। এই গানটির ডিজিটাল ডাউনলোড ও স্ট্রিমিং থেকেও শাকিরার ঝুলিতে প্রায় ১ কোটি ডলারের বেশি আয় আসে। গানটির মিউজিক ভিডিওতে শাকিরা তাঁর পুত্র মিলান এবং তৎকালীন সঙ্গী পিকে ছাড়াও নেইমার, মেসি, সেস ফ্যাব্রেগাস, হামেস রদ্রিгеজের মতো সমসাময়িক সুপারস্টারদের হাজির করেন। এই গানটির মূল শক্তি ছিল এর ভেতরের আদিম ফুটবল উন্মাদনা এবং লাতিন আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী ছন্দের নিখুঁত উপস্থাপন।

ব্রাজিলের ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়ামে ফাইনাল ম্যাচের সমাপনী অনুষ্ঠানে শাকিরা যখন লাল পোশাকে আবির্ভূত হন, তখন পুরো স্টেডিয়াম তাঁর নামের জয়ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। তাঁর কোলে ছিল ছোট্ট পুত্র মিলান, আর পেছনে ছিল ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী সাম্বা নৃত্যশিল্পীদের দল। শাকিরার এই পারফরম্যান্স প্রমাণ করে দেয় যে, অফিশিয়াল স্ট্যাটাস থাকুক আর না থাকুক, বিশ্বকাপের আসল গ্ল্যামার ও সুরের রানি তিনিই।

ফুটবল, গ্ল্যামার ও সংস্কৃতির এক বৈশ্বিক আইকন

২০০৬ থেকে শুরু করে টানা তিনটি বিশ্বকাপে শাকিরার এই একক আধিপত্য কেবল কিছু জনপ্রিয় গানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ফুটবল বিশ্বকাপের সংজ্ঞাটাই বদলে দিয়েছেন। তাঁর আগমনের আগে বিশ্বকাপ ছিল মূলত একটি নির্দিষ্ট ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, যেখানে পুরুষ ফুটবলারদের মাঠের লড়াই-ই ছিল মুখ্য। কিন্তু শাকিরা তাঁর লাতিন আমেরিকান গ্ল্যামার, অনবদ্য কণ্ঠ, সামাজিক বার্তা এবং অবিশ্বাস্য নাচের জাদুতে এই ক্রীড়া আসরকে সংস্কৃতির এক আন্তর্জাতিক মহোৎসবে রূপান্তর করেছেন।

তিনি বিশ্বকে দেখিয়েছেন যে, গ্যালারির দর্শক এবং মাঠের খেলোয়াড়দের মধ্যের দূরত্ব কীভাবে একটি গানের মাধ্যমে ঘুচিয়ে দেওয়া যায়। শাকিরার গানগুলোতে সবসময় ফুটে উঠেছে একতা, বর্ণবাদ বিরোধী বার্তা এবং বিশ্বভ্রাতৃত্বের আহ্বান। আফ্রিকার জোহানেসবার্গ থেকে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো—সবখানেই তিনি স্থানীয় সংস্কৃতিকে সম্মান জানিয়ে নিজের সুরের সাথে বুনে দিয়েছেন।

ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে বহু নামী-দামী শিল্পী গান গেয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও গাইবেন। কিন্তু শাকিরার মতো করে ফুটবলের আবেগকে নিজের কণ্ঠে ধারণ করা, বিলিয়ন বিলিয়ন ভিউয়ের রেকর্ড গড়া, কোটি ডলারের অর্থনৈতিক সাফল্য আনা এবং টানা তিনটি আসরে বিশ্বকে এক সুরে নাচানোর কীর্তি আর কেউ দেখাতে পারেননি। মাঠের সবুজ ঘাসে জিনেদিন জিদান, লিওনেল মেসি বা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোদের পায়ের জাদু যেভাবে ফুটবল ইতিহাসের সোনালী পাতায় লেখা থাকবে, তেমনি বিশ্বকাপের মঞ্চ কাঁপানো শাকিরার সুর, জনপ্রিয়তা, আয় আর গ্ল্যামারের এই মহাকাব্যও ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। শাকিরা কেবল একজন পপ তারকা নন, তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য এবং চিরযৌবনা অধ্যায়।

 

আরও পড়ুন

লোড হচ্ছে...