
খেলা দেখুন আইস্ক্রিনে
-এ শুরু হয়েগেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল উৎসব ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই আসরকে ঘিরে ইতোমধ্যে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আমেজ।
মেসি...মেসি...মেসি। সারা বিশ্বেই তাঁর বন্দনা চলছে। লিওনেল মেসি নিজেকে এখন এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যাকে এককথায় বলতে হয় ‘আনপ্যারালাল’ বা অতুলনীয়। ফুটবলার হিসেবে আমাদের অনেকেরই অনেকের প্রতি আবেগ বা পছন্দ থাকতে পারে, সেটা ভিন্ন জিনিস। কিন্তু মেসি নিজেকে যে স্তরে উন্নীত করেছেন, সেখানে বর্তমানে আর কাউকে দেখা যায় না। মেসি নির্দ্বিধায় বিশ্ব ফুটবলের সেরা নাম।
মেসির শ্রেষ্ঠত্ব শুধু তাঁর পায়ের জাদুতে নয়, চরিত্রেও। এত বছর ধরে বিশ্ব মাতাচ্ছেন, অথচ মাঠে তাঁকে কখনো কোনো উগ্রতা দেখাতে দেখিনি। মাঠের বাইরেও আচরণ দারুণ শিক্ষণীয়। সতীর্থরা তাঁকে যে পরিমাণ শ্রদ্ধা করেন ও ভালোবাসেন, ম্যাচের সময়ই যেভাবে মেসিকেই খোঁজেন, তা থেকেই বোঝা যায়, একজন নেতা হিসেবে মেসি কতটা সফল।
মেসি যে কত বড় মাপের বিনয়ী খেলোয়াড় তা কল্পনাও করা যায় না। যার মধ্যে এমন মানবিক গুণ আর মাঠকাঁপানোর অসাধারণ ধারাবাহিক ক্ষমতা থাকে, তাঁর পক্ষে চূড়ায় ওঠা সম্ভব।
মেসি সর্বকালের সেরা কি না, তা নিয়ে আর তর্কের কোনো অবকাশ নেই। মেসিই সর্বকালের সেরা ফুটবলার। মুখের কথা নয়, রেকর্ডই বলছে তা। একজন খেলোয়াড়কে বিচার করা হয় তাঁর পারফরম্যান্স দিয়ে। ৩৯ বছরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও বিশ্বকাপের মঞ্চে দুই ম্যাচে পাঁচ গোল এবং দুটি ম্যাচেই সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পাওয়ার এক অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা দেখিয়েছে মেসি। আমার তো মনে হয়, এভাবে চললে মেসিই এই বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হবেন।
অস্ট্রিয়া ম্যাচে বক্সের বাইরে থেকে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে গোল করার ধরন ছিল দেখার মতো। বলটা মারার পরেই বোঝা গিয়েছিল, এটা জালে জড়াবে। যেখানে বলটা রাখার কথা, সেখানেই রেখেছেন, সঙ্গে প্রচ- গতি। এসব দৃশ্য এমনি এমনি তৈরি হয় না, প্রতিভা লাগে।
পেলে-ম্যারাডোনার সঙ্গে মেসিকে তুলনা করতে গেলে বলব, যুগভেদে তাঁদের আলাদা করা কঠিন। পেলে-ম্যারাডোনাদের সময়ে খেলার ধরন ছিল ভিন্ন, ম্যাচের গতি আলাদা ছিল। এখন আরেক রকম। ফলে তিন প্রজন্মকে দাঁড়িপাল্লায় তুলে মাপা সহজ নয়। পেলের খেলা আমি রেকর্ডেড দেখেছি। পেলে ফুটবলকে একটা শৈল্পিক রূপ দিয়েছিলেন। ম্যারাডোনা কম উচ্চতা নিয়েও গতি আর বল নিয়ন্ত্রণে দেখিয়েছেন নিজস্ব জাদুকরি শৈলী। একা হাতে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন। কিন্তু মেসি হলেন ফুটবলের সবকিছুর একটা নিখুঁত সমন্বয়। তাঁর ভেতরে সব গুণ আছে। এই বয়সেও তরুণ প্রতিপক্ষরা বল নিয়ে মেসির সঙ্গে পেরে উঠছে না, এখানেই তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব।
পেলে-ম্যারাডোনাকে নিয়ে বিতর্ক চিরকাল থাকবে। তবে আমার মতে মেসিকে সবার উপরে আলাদা রেখে তারপর বাকিদের নিয়ে বিতর্ক করা উচিত। এমনকি এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচে মেসি হ্যাটট্রিক করার পর ব্রাজিলের কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিও বলেছেন, মেসিই সর্বকালের সেরা। বিশ্ব ফুটবলের বড় বড় বোদ্ধাদের মুখেও এখন একই কথা, যার সঙ্গে আমি পুরোপুরি একমত।

মেসির খেলা দেখার অনুভূতিই অন্য রকম। এই বয়সের মেসি বল পায়ে দৌড়াচ্ছে, প্রতিপক্ষের যেন কিছু করার নেই। শৈল্পিক ব্যাপারটা তো আছেই। অস্ট্রিয়ার ম্যাচে আমি অপেক্ষা করছিলাম, মেসি গোল করবেন কখন। পেনাল্টি মিস করার পর চাইছিলাম, কত তাড়াতাড়ি গোলটা করবেন, যাতে তাঁর অসম্মান না হয়। মানুষের ভালোবাসা নিয়েই যেন মাঠ থেকে বেরোতে পারেন। বুঝতেই পারছেন, কেমন অনুভূতি ছিল তাঁর খেলা দেখার। শেষ বাঁশির পর মাঠ থেকে যাওয়ার সময় সমর্থকেরা দাঁড়িয়ে অভিনন্দন জানিয়েছে মেসিকে। এর চেয়ে বেশি কিছু মেসি হয়তো চাইতে পারতেন না।
আর্জেন্টিনা দল নিয়ে বলতে গেলে তারা এখন নিজেদের আরও মেলে ধরেছে। দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত একটা দল। শুধু গায়ের জোরে বা ধাক্কাধাক্কি করে খেলা নয়; বরং টেকনিক্যাল ফুটবল খেলে জিততে চায় এই দলটি। স্কালোনির দলের ইতিবাচক মানসিকতা এবং খেলার মান দুর্দান্ত। আমি তো এবারের বিশ্বকাপের সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ইউরোপের কথা বলে আসছিলাম, এখন মনে হচ্ছে আর্জেন্টিনার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
যে দলে মেসির মতো একজন প্রাণভোমরা আছেন, তাঁর ওপর পুরো দল চোখ বন্ধ করে ভরসা করতে পারেন। সব মিলিয়ে এই দলের পারফরম্যান্স বিশ্বমঞ্চে তাদের সম্ভাবনাকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। মেসি মানুষের ভালোবাসা নিয়ে বীরের মতো ফুটবল ক্যারিয়ার শেষ করবেন, এটাই একজন ফুটবলপ্রেমী হিসেবে আমার চাওয়া। এই ফুটবল জাদুকর ফুটবলকে যা দিয়েছেন, তার কোনো তুলনা হয় না। তাই আবারও বলছি, মেসিই সর্বকালের সেরা ফুটবলার।
মেসিকে নিয়ে কথা বলতে বলতে ক্লান্ত স্কালোনি
লিওনেল স্কালোনি যথার্থই বলেছেন! কতবারই-বা বলা যায়! লিওনেল মেসি তো প্রায় প্রতি ম্যাচেই পারফর্ম করেন, রেকর্ড গড়েন। তাঁর প্রশংসা করতে করতে ক্লান্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক, স্কালোনি হয়েছেনও।
গতকাল অস্ট্রিয়া ম্যাচে আর্জেন্টিনার ২-০ গোলের জয়ের ম্যাচে জোড়া গোল করা মেসিকে নিয়ে তাই স্কালোনি বলেছেন এভাবে-মেসিকে নিয়ে কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে যেতে হয়।
বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে মেসি করেছিলেন হ্যাটট্রিক, তারপর করেছেন জোড়া গোল। অথচ শুরুটা তাঁর ভালো ছিল না। ম্যাচের ৯ মিনিটের সময় পোস্টের বাইরে পেনাল্টি শট নেন মেসি। সেই হতাশা কাটিয়ে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে জোড়া গোল করেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। তাই আরও একবার মেসিকে প্রশংসায় ভাসাতে হয়েছে স্কালোনির।
কাল ম্যাচ শেষে স্কালোনি বলেন এভাবে, ‘দল যখন খারাপ খেলছিল, তখনো লিও (মেসি) বল কেড়ে নিয়েছে, নিবেদিত ছিলেন। এই যে নিবেদন, তার পেছনে অবশ্যই একটা বড় কারণ আছে। আর এই চেতনাটা ও দলের সবার মধ্যে নিয়ে আসে। আমি আর কী বলব, ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না, এ নিয়ে কথা বলতে বলতে আমরা ক্লান্ত। লিও যখন জ্বলে ওঠে, তখন দলের সবাই জ্বলে ওঠে।’
কালকের জয়ে পরের রাউন্ডে পৌঁছে গেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। সেটাও গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে। স্বাভাবিকভাবে স্কালোনি দলের সাফল্যে খুশি, ‘অস্ট্রিয়া কঠিন দল। লম্বা ও শারীরিকভাবে শক্তিশালী। তাদের সঙ্গে জয়ে পরের রাউন্ডে যেতে পেরে খুশি। আমরা ধৈর্য ধরে বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলাম, আমরা জানতাম যে আমরা আমাদের চেনা ছন্দ খুঁজে পাচ্ছি এবং আমরা সুযোগও তৈরি করেছি।’
স্কালোনি লাওতারো মার্তিনেজ, হুলিয়ান আলভারেজদেরও প্রশংসা করেছেন, ‘লাওতারো দারুণ খেলেছে। ও আর আলভারেজ দলের বার্তা ভালো বুঝতে পারে। লিসান্দ্রো মার্তিনেজও নিজের কাজ করায় আমরা খুশি। আর ওতামেন্দি যেভাবে মাঠে নেমে হাল ধরছে, তা আমাদের দারুণ স্বস্তি দিচ্ছে। আমরা ওদের পারফরম্যান্সে খুশি।

ক্লোসা বললেন, ‘মেসিই সর্বকালের সেরা’
মুখে যে যতই বলুক, রেকর্ড গড়াই হয় ভাঙার জন্য-একটু খারাপ তো লাগারই কথা। কিন্তু রেকর্ড ভাঙা সেই মানুষটির নাম যদি হয় লিওনেল মেসি, তাহলে? তখন কেউ কেউ বলে দেন, আমার কাছে লিওনেল মেসিই সর্বকালের সেরা।
বিশ্বকাপ ফুটবলে সর্বোচ্চ গোল-সব ধরনের খেলা মিলিয়েই এটি ভীষণ মর্যাদার এক রেকর্ড। সেটা এতদিন ক্লোসার দখলেই ছিল। ডালাসে গতকাল রাতে জার্মান কিংবদন্তির সেই রেকর্ড ভেঙে দেন মেসি। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে জোড়া গোল করে পেছনে ফেলেন ক্লোসাকে।
চারটি বিশ্বকাপে ২৪ ম্যাচে ১৬ গোল করে গত ১২ বছর ধরে রেকর্ডটি নিজের দখলে রেখেছিলেন ক্লোসা। মেসি এবার তাঁর ক্যারিয়ারের ছয় নম্বর বিশ্বকাপে এসে ২৮ ম্যাচে ১৮ গোল করে রেকর্ডটি একার দখলে নিলেন। অস্ট্রিয়া-আর্জেন্টিনা ম্যাচের আগে রেকর্ডটির যৌথ ভাগীদার ছিলেন তাঁরা দুজন।
২০১৬ সালের ১ নভেম্বর পেশাদার ফুটবল ছেড়ে দেওয়া ৪৮ বছর বয়সী ক্লোসা এখন জার্মান ফুটবলে দ্বিতীয় স্তরের ক্লাব নুরেমবার্গের কোচ। মেসি তাঁর রেকর্ডটি ভেঙে ফেলার পর জার্মানির সংবাদমাধ্যম ‘ডয়েচে জেইতাং’কে ক্লোসা বলেছেন, ‘আমার কাছে লিওনেল মেসিই সর্বকালের সেরা। অভিনন্দন চ্যাম্পিয়ন!’
জার্মান কিংবদন্তি গার্ড মুলারের ১৪ গোলের রেকর্ড ২০০৬ বিশ্বকাপে ভেঙে ফেলেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিও। এর আট বছর পর ২০১৪ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষেই রোনালদোর রেকর্ড ভেঙে ফেলেন ক্লোসা।
বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ন্যূনতম ১০ গোল করেছেন মাত্র ১৬ জন খেলোয়াড়। তাঁদের মধ্যে এবারের বিশ্বকাপে খেলছেন মাত্র তিনজন-আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি (১৮ গোল), ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে (১৫ গোল) এবং ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন (১০ গোল)। ২৭ বছর বয়সী এমবাপ্পের মেসির এই রেকর্ড ভেঙে ফেলার সুযোগটা অনেক বেশি।
ক্লোসার ক্যারিয়ারে প্রথম বিশ্বকাপ ২০০২ সালে। তখন তাঁর বয়স ছিল ২৪ বছর; আর ২০০৬ সালে নিজের অভিষেক বিশ্বকাপে মেসি উদ্যাপন করেন তাঁর ১৯তম জন্মদিন।
বিশ্বকাপে মোট ১৭৯৩ মিনিট মাঠে থেকে ৬৬টি শটে ১৬টি গোল পেয়েছেন ক্লোসা। মেসি বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়া ম্যাচ পর্যন্ত মাঠে ছিলেন মোট ২৪৮৪ মিনিট। ১১৮টি শট নিয়ে পেয়েছেন ১৮ গোল। ক্লোসার চেয়ে ৫২টি শট বেশি নিয়েছেন মেসি।
বিশ্বকাপে ক্লোসা তাঁর নেওয়া মোট শটের ২৪ শতাংশই গোলে রূপান্তর করেছেন, যেখানে মেসির হার ১৫ শতাংশ। প্রতি গোলে কত মিনিট সময় লেগেছে, সেই গড়েও মেসিকে (১৩৮ মিনিট) পেছনে ফেলেছেন ক্লোসা (১১২ মিনিট)।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন-ক্লোসা জার্মানির জার্সিতে খেলেছেন নিখাদ স্ট্রাইকার হিসেবে। কিন্তু মেসি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড গড়লেন প্লে-মেকার হিসেবে।

গোল করেই তাঁর দিকে ছুটলেন মেসি, কে এই সাংবাদিক
আর্জেন্টিনা-অস্ট্রিয়া ম্যাচে তখন ৯৫তম মিনিট। দলের জয় অনেকটাই নিশ্চিত, বাকি শুধু শেষ বাঁশি। সে মুহূর্তেই নিজের দ্বিতীয় গোলটি করলেন লিওনেল মেসি। সাধারণত এমন সময় ফুটবলাররা ছুটে যান সতীর্থদের কাছে কিংবা কর্নার ফ্ল্যাগের সামনে। কিন্তু মেসিকে দেখা গেল কিছুটা ভিন্ন পথে। গোল করার পর তিনি দৌড়ে গেলেন গোলপোস্টের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা এক সাংবাদিকের দিকে। কাছে গিয়ে হাত মেলালেন তাঁর সঙ্গে।
মুহূর্তটি ক্যামেরায় ধরা পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় আলোচনা-কে এই সাংবাদিক, যাঁর সঙ্গে গোল উদ্যাপন করলেন মেসি?
তাঁর নাম হোয়াকিন ব্রুনো। আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় ক্রীড়া চ্যানেল টিওয়াইসি স্পোর্টসের প্রতিবেদক। ম্যাচের পর নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে ব্রুনো বলেছেন, ঘটনাটি এখনো তাঁর কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে।
মেসির সেই গোলের আগপর্যন্ত আর্জেন্টিনা এগিয়ে ছিল ১-০ ব্যবধানে। অস্ট্রিয়া বারবার আক্রমণে উঠে সমতায় ফেরার হুমকি দিচ্ছিল। ম্যাচের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির কথা স্মরণ করে ব্রুনো লিখেছেন, ‘স্নায়ুচাপ তখনো কাটেনি। ভেতরে-ভেতরে আবেগের ঢেউ চলছিল।’
সেই সময় ব্রুনো গোলপোস্টের পেছনে একাই ছিলেন। তাঁর সহকর্মী গাস্তোন এদুল ম্যাচ-পরবর্তী সাক্ষাৎকার নিতে মিক্সড জোনে চলে গিয়েছিলেন। ৯৫তম মিনিটের সেই নাটকীয় মুহূর্তে প্রথমে শট নেন হুলিয়ান আলভারেজ, কিন্তু অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষক আলেকজান্ডার শ্লাগার তা ঠেকিয়ে দেন। ফিরতি বলে শট নেন মেসি, সেটিও রুখে দেয় অস্ট্রিয়ার রক্ষণ। তবে তৃতীয় চেষ্টায় আর ভুল করেননি আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
ব্রুনো তখন ঘটনাস্থল থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে ছিলেন। গোল হতেই তিনি নিজেকে আর সামলাতে পারেননি। ‘পাগলের মতো চিৎকার করে উঠি, যেন আমি কোনো সাংবাদিক নই, আর্জেন্টিনারই একজন সমর্থক’-টিওয়াইসিতে লিখেছেন তিনি।
ব্রুনোর ভাষায়, ‘দেখি, লিও আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি তখনো চিৎকার করছি আর সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কাছে এসে আমার সঙ্গে হাত মিলিয়ে উদ্যাপন করল।’
ঘটনার পরপরই স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে টিওয়াইসি স্পোর্টসকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় ব্রুনো বলেন, ‘এখনো কাঁপছি, পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারিনি। লিও এসে এখানে দ্বিতীয় গোল উদ্যাপন করল, আমাকে চিৎকার করতে দেখে হাত মেলাল। বিশ্বাস করতে পারছি না। এটা আমার সাংবাদিক জীবনের সেরা দিনগুলোর একটি।’
কিছুক্ষণ পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্রুনো আরও লেখেন, ‘একজন আর্জেন্টাইন ফুটবলপ্রেমী, একজন মেসি-ভক্তের জন্য এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এই মুহূর্ত আর সেই ছবিটা আমি সারা জীবন মনে রাখব।’
তবে তখনো একটি দুশ্চিন্তা ছিল তাঁর-সেই মুহূর্তের ছবি আদৌ পাওয়া যাবে তো? তাই সহকর্মীদের কাছে অনুরোধ করেছিলেন, ‘ছবিটা দরকার আমার, ছবিটা থাকতেই হবে।’
সৌভাগ্যবশত ফটোগ্রাফাররা মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দী করেছিলেন। ঘটনার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তাঁর ফোনে অসংখ্য বার্তা আসতে শুরু করে। সবাই তাঁকে সেই ছবিটাই পাঠাচ্ছিলেন।
কে এই হোয়াকিন ব্রুনো
টিওয়াইসি স্পোর্টসের পরিচিত মুখ হোয়াকিন ব্রুনো। সাংবাদিকতা শুরু করেন আর্জেন্টাইন ক্লাব রেসিংয়ের খবর কাভার করে। পরে তিনি জনপ্রিয় ফুটবল বিশ্লেষণমূলক অনুষ্ঠান ‘প্রেসিওন আলতা’র প্যানেলিস্ট হিসেবেও পরিচিতি পান।
এবারের বিশ্বকাপে টিওয়াইসি স্পোর্টসের হয়ে আর্জেন্টিনা দলের মিনিটে মিনিটে কাভারেজ করছেন ব্রুনো। তবে বিশ্বকাপের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তটি সম্ভবত কোনো সংবাদ প্রতিবেদনে নয়, ধরা থাকবে একটি ছবিতে, যেখানে গোল করার পর লিওনেল মেসি এগিয়ে যাচ্ছেন তাঁর দিকেই।

এই বিস্ময় বালকের হাতেই কি এবারের বিশ্বকাপ
মতিউর রহমান চৌধুরী, বিশ্বকাপের আসর থেকে
ফুটবল বিশ্বের নয়া পোস্টার বয় লামিন ইয়ামাল। নিউ ইয়র্কের টাইম স্কয়ারের বিলবোর্ডে তার বিশাল ছবি। ভাবা যায়! মাত্র ১৮ বছর বয়সে টাইম স্কয়ারের মতো স্থানে ইয়ামালের এই উপস্থিতি। বলুন তো এতে কী প্রমাণ হয়। স্প্যানিশ তারকা লামিন ইয়ামাল শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং বিশ্ব ফুটবলে নিজেকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। বিশ্বের তাবৎ মিডিয়া বিস্ময় বালক হিসেবেই তাকে চিহ্নিত করেছে। এই মুহূর্তে বিশ্ব ফুটবলের এক নম্বর মুকুটহীন সম্রাট। অনেকে তার মধ্যে আরেক মেসির ছায়া স্পষ্ট দেখতে পান। লামিন ইয়ামালের গায়ে বার্সেলোনার ঐতিহ্যবাহী ১০ নম্বর জার্সি। স্পেনের হয়েই ইউরো-২০২৪ জয় করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন।
জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গোল করেছেন ৫৩টি। তার ক্যারিয়ার রীতিমতো চোখ ধাঁধানো। পারিবারিক অস্থিরতার মধ্যেই বড় হন। মাত্র তিন বছর বয়সেই তার বাবা-মায়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে। লামিনের দাদি এসেছিলেন মরক্কো থেকে। অবৈধ অভিবাসী হিসেবে এখানে-ওখানে থাকতেন। শেষমেশ তার ঠাঁই হয় স্পেনের মাতারো শহরে। মা আসেন ইকুয়েটোরিয়াল গিনি থেকে। মাথাগোঁজার ঠাঁই ছিল না। যাযাবরের মতো থাকতেন। দারিদ্র্যতা ছিল তার নিত্যসঙ্গী। এখন বিবেচনা করলে মনে হবে, এটা এক রোমাঞ্চকর বাস্তব জীবন। যা কিনা সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। আর্থিক কষ্টের মধ্যে মাতারো শহরের দুইজন সহৃদয় ব্যক্তি সাহায্যের হাত বাড়ান।
এই মুহূর্তে ইনজুরি সমস্যায় ভুগছেন লামিন। তবুও কোচ তাকে মাঠে নামাবেনই। কেপ ভার্দের সঙ্গে স্পেন ড্র করে। বিশ মিনিট মাঠে নামেন অবশ্য। সৌদি আরবের সঙ্গে খেলেছেন একটু বেশি সময়। গোলও পেয়ে গেছেন। গোলের পর দুই হাতের আঙ্গুল দিয়ে ৩০৪ চিহ্নটি দেখান। এর পেছনে একটা ইতিহাস রয়েছে। এটা আসলে রোকো ফন্ডা এলাকার পোস্টাল কোড। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বকে পিছিয়ে পড়া শ্রমজীবী মানুষের পরিচয়কে তুলে ধরতে চান। খ্যাতির চূড়ায় এখন অনেকটা শীর্ষে। এর মধ্যে লামিনের জীবনে যুক্ত হয়েছে নানা চাঞ্চল্যকর বিতর্ক। ইয়ামালের মূল অনুপ্রেরণা কিন্তু ব্যালন ডি’অর বা কোটি টাকার জাঁকজমকপূর্ণ জীবন নয়। তিনি পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তন করতে চান। ইয়ামালের মা কাজ করতেন ম্যাকডোনাল্ডসে। হাড়ভাঙা খাটুনি। তারকা হয়ে উঠার পর লামিন তার মা’র জীবনটা বদলে দিয়েছেন। কিনে দিয়েছেন এক বিলাসবহুল বাড়ি।
চাচা কাজ করতেন এক বেকারিতে। তার জীবনও পাল্টে গেছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে- এখনো তিনি মরক্কো ও ইকুয়েটোরিয়াল গিনিকে স্মরণ করেন। তার বুটে আঁকা থাকে ওই দু’টি দেশের পতাকা। এতে তিনি প্রমাণ করতে চান-অতীত যত কুয়াশাচ্ছন্নই হোক না কেন- সেটা তিনি ভুলতে চান না। একদিকে মাঠের পারফরম্যান্স ধরে রাখার অবিশ্বাস্য চাপ। অন্যদিকে জীবনের নানামুখী আইনি বিতর্ক। মিডিয়ার নজর তো আছেই। বার্সেলোনার প্রধান কোচ হান্সি ফ্লিক বলেছেন, লামিনের জীবন এক অবিশ্বাস্য নাটকীয়তায় ভরা। তার মতে, শুধু প্রতিভা নয়, কঠোর পরিশ্রম করতে হবে এসব ধরে রাখতে। অসাধারণ ড্রিবলিং ক্ষমতার পাশাপাশি বর্ণবাদের বিরুদ্ধেও তার অবস্থান স্পষ্ট।
রিয়েল মাদ্রিদের সাবেক তারকা ডিফেন্ডার মিশেল সালগাডো ইয়ামালের প্রশংসা করেছেন। বলেছেন, আমাদের সামনে এক নতুন মেসিকে দেখা যাচ্ছে। জনপ্রিয় খেলার কাগজ ‘মার্কা’ বলেছে, এই তরুণ তারকা তার ক্যারিয়ারের সঠিক পথটি বেছে নিয়েছেন। সৌদি আরবকে ৪-০ গোলে পরাজিত করার পর বলা হচ্ছে, স্পেনকে ফাইনালে পৌঁছানো এখন আর কোনো অলীক কল্পনা নয়। একটি বাস্তব সম্ভাবনা। বিশ্বকাপের আসরে লামিন ইয়ামালকে নিয়ে অনেকেই অংক মেলাচ্ছেন। বলছেন, এই বিস্ময় বালকের হাতেই কি এবারের বিশ্বকাপ!
লিখলেন নতুন ইতিহাস
অবিশ্বাস্য এক ম্যাচ উপহার দিয়েছেন কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়ারয়টার্স স্পেন-কেপ ভার্দের ম্যাচের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে ২০০১ সালে মুক্তি পাওয়া হংকংয়ের বিখ্যাত ‘শাওলিন সকার’ সিনেমার একটি দৃশ্য-যেখানে প্রতিপক্ষের নেওয়া একের পর এক শট ঠেকিয়ে যাচ্ছেন গোলরক্ষক। আগুনের গোলার মতো আসা বলটি গোলকিপারের শরীর রক্তাক্ত করলেও তাঁকে একটুও টলাতে পারেনি।
চলচ্চিত্রের এই দৃশ্যের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে কেপ ভার্দের গোলরক্ষকের ছবি। স্পেনের বিপক্ষে কেপ ভার্দে গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার পারফরম্যান্স যাঁরা দেখেছেন, তাঁদের কাছে এই কোলাজ মোটেই বাড়াবাড়ি মনে হওয়ার কথা নয়। বরং চলচ্চিত্রের নাটকীয়তাকেও যেন ছাড়িয়ে গেছে ভোজিনিয়ার একেকটি বিস্ময়কর সেভ!
বিশ্বকাপের অন্যতম ফেবারিট স্পেনের বিপক্ষে গোলপোস্টে ভোজিনিয়া একাই তুলে দিয়েছিলেন চীনের প্রাচীর। একটু ভুল হলো, কেপ ভার্দের প্রাচীর। এককথায় অবিশ্বাস্য!
বলা হয়, গোলকিপাররা যেদিকে হেঁটে যান, সেদিকে ঘাস ওঠে না। এমনকি ম্যাচে হারের দায়ও বেশির ভাগ সময় বর্তায় গোলকিপারের কাঁধে। কিন্তু ভোজিনিয়া আজ পোস্টের নিচে গোলকিপারদের জয়গান গেয়েছেন। শুধু ঘাস নয়, ফুলও ফুটিয়েছেন।
৪০ পেরোনো অখ্যাত এই গোলরক্ষকের সামনে স্পেনের তারকাপুঞ্জের আলো নিভে যায়। ম্যাচজুড়ে অন্তত সাতটি নিশ্চিত গোল সেভ করেন। এ ছাড়া অসংখ্যবার দুর্দান্ত পজিশনিংয়ের কারণে একটি পিন ঢোকানোর মতো জায়গাও ছাড়েননি স্পেনের আক্রমণভাগের জন্য।
ভোজিনিয়ার একক প্রাচীর ভাঙতেই একপর্যায়ে বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা তারকা লামিনে ইয়ামালকে মাঠে নামান স্পেন কোচ দে লা ফুয়েন্তে। নয়তো এই ম্যাচে খেলার কথাই ছিল না তাঁর। কিন্তু ১৮ বছর বয়সী ইয়ামালকেও নিজের সামনে ‘পুঁচকে’ শিশু বানিয়ে রেখেছেন ভোজিনিয়া। অবশ্য বয়স বিবেচনা করলে ইয়ামাল ভোজিনিয়ার সামনে শিশুই।
কেপ ভার্দের বিপক্ষে বদলি নামার সময় ইয়ামালের বয়স ছিল ১৮ বছর ৩৪২ দিন। আর ভোজিনিয়ার বয়স ৪০ বছর ২২ দিন। ভোজিনিয়া ও ইয়ামালের মধ্যে বয়সের ব্যবধান ২১ বছর ৪৫ দিন! বিশ্বকাপের ইতিহাসে ম্যাচে দুই প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের মধ্যে এটাই সবচেয়ে বেশি বয়সের ব্যবধান। ওহ, ভোজিনিয়া কিন্তু ইয়ামালের বাবারও দুই বছরের বড়!
১৯৬৬ বিশ্বকাপের পর থেকে এখন পর্যন্ত ৪০ বা এর বেশি বয়সী গোলরক্ষক এক ম্যাচে মাত্র একবারই ভোজিনিয়ার চেয়ে বেশি সেভ করতে পেরেছেন। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে নিজের ৪১তম জন্মদিনে ব্রাজিলের বিপক্ষে উত্তর আয়ারল্যান্ডের হয়ে ১০টি সেভ করেছিলেন প্যাট জেনিংস।
উদ্যাপনের মধ্যমণিও ভোজিনিয়ারয়টার্স
সাতটি সেভ ছাড়াও এ ম্যাচে ৬৯ শতাংশ সঠিক পাস (৪২টির মধ্যে ২৯টি) দিয়েছেন ভোজিনিয়া। অন্যান্য পরিসংখ্যানের মধ্যে নিখুঁত লং বল দিয়েছেন ৪৩ শতাংশ, ডাইভিং সেভ ৩টি এবং বক্সের ভেতর সেভ করেছেন ৬টি।
অবিশ্বাস্য এই পারফরম্যান্সের পর ম্যাচ শেষে কেঁদেছেন ভোজিনিয়া। তাঁকে নিয়ে সাবেক স্কটিশ উইঙ্গার ও বিবিসির ফুটবল বিশ্লেষক প্যাট নেভিন লিখেছেন, ‘পুরো ম্যাচেই আলো ছড়িয়েছেন ভোজিনিয়া। ৪০ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে মাঠে যা দেখালেন, তা এককথায় অবিশ্বাস্য, দুর্দান্ত! ম্যাচ শেষে স্টেডিয়ামের প্রতিটি ক্যামেরার চোখ এখন তাঁর দিকেই। সতীর্থ খেলোয়াড়দের সবাই আঙুল উঁচিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন দলের এই আসল নায়ককে। ফুটবল মাঠে সত্যিই এটি এক দারুণ আবেগঘন ও দৃষ্টিনন্দন মুহূর্ত।’
সাবেক ইংলিশ ডিফেন্ডার লি ডিক্সন লিখেছেন, ‘সত্যিই কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি। এটা এককথায় অবিশ্বাস্য, দুর্দান্ত এক পারফরম্যান্স! এই একটি পয়েন্ট তাদের (কেপ ভার্দে) প্রাপ্য ছিল, যেকোনো কিছুর চেয়েও বেশি। আর স্পেন? তারা তো মনে হয় এক পয়েন্ট পাওয়ারও যোগ্য ছিল না। আজকের রাতটা শুধুই কেপ ভার্দের। ভোজিনিয়া কাঁদছেন-তা দেখে তো আমার নিজেরই প্রায় কান্না চলে আসছে।’
ভোজিনিয়ার কান্নায় ভিজেছেন ফুটবলপ্রেমীরা। এই ম্যাচের আগে ইনস্টাগ্রামে তাঁর অনুসারী ছিল ৪৫ হাজার। ম্যাচের পর সেটা ১০ লাখ পেরিয়ে গেছে!
ভোজিনিয়ার এই কান্না তাই আনন্দের। এই কান্না গোলিয়াথের বিপক্ষে ডেভিডের জয়ের। আন্ডারডগদের এমন গল্প তো আর প্রতিদিন লেখা হয় না। ভোজিনিয়া আসলে কান্নার ভাষায় লিখেছেন আনন্দের ইতিহাস।
ভোর চারটায় উঠে কারখানায় যেতেন, এখন জার্মানিকে বিশ্বকাপের নকআউটে তুললেন
ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠতে হতো। যেতে হতো কারখানায়। টানা আট ঘণ্টা লেজার মেশিন চালিয়ে ছুটতেন অনুশীলনে। বাড়িতে ফিরতে ফিরতে রাত আটটা। এই ছিল ডেনিজ উনদাভের ১৭ বছর বয়সের একেকটি দিনের গল্প।
সেই ছেলেটিই আজ ১২ বছর পর বিশ্বকাপে জার্মানির নকআউটে ওঠার নায়ক।
জার্মানি চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। সব আসরেই শিরোপার অন্যতম দাবিদার। কিন্তু জার্মানির এবারের নকআউটে ওঠা ছোটখাটো ঘটনা নয়। ২০১৪ বিশ্বকাপে ট্রফি জেতার পর ইউরোপিয়ান দলটি আর নকআউটে উঠতে পারেনি। সর্বশেষ দুই আসরেই বিদায় নিতে হয়েছে গ্রুপ পর্ব থেকে। এবার জার্মানরা সেই বাধাই টপকাল উনদাভের হাত ধরে। তা-ও কীভাবে?
শনিবার রাতে টরন্টোর বিএমও ফিল্ডে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে জার্মানি যখন ১-০ গোলে পিছিয়ে, ঠিক সেই মুহূর্তে মাঠে নামলেন উনদাভ। এরপরের গল্পটা স্বপ্নের মতো। ৬৮তম মিনিটে নাদিম আমিরির ক্রস থেকে বাঁ পায়ের ভলিতে সমতা, তারপর যোগ করা সময়ে বক্সের কিনারে বল পেয়ে শক্তিশালী শটে জাল কাঁপিয়ে ২-১। উনদাভের জোড়া গোলে জার্মানি উঠে গেল বিশ্বকাপ নকআউটে।
উনদাভ অবশ্য জার্মানির প্রথম ম্যাচে কুরাসাওয়ের বিপক্ষেও গোল করেছিলেন। সেটিও বদলি নেমেই। সব মিলিয়ে দুই ম্যাচে বেঞ্চ থেকে নেমে তিন গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট। ১৯৬৬ সালের পর এক আসরে বদলি খেলোয়াড়দের মধ্যে যা যৌথভাবে সর্বোচ্চ। ১৯৯০ আসরে রজার মিলা আর ২০২৬ আসরে উনদাভ-তালিকাটা এটুকুই।
অথচ কয়েক বছর আগেও এই উনদাভের পরিচয় ছিল অন্য রকম। সপ্তাহে ১২০ পাউন্ড মজুরিতে কাজ করতেন একটি কারখানায়।
উনদাভের বেড়ে ওঠা জার্মানির ছোট শহর আখিমে। কুর্দি-ইয়াজিদি পরিবারে জন্ম নেওয়া উনদাভের মা-বাবা তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্ত অঞ্চল থেকে জার্মানিতে অভিবাসী হয়ে এসেছিলেন। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট উনদাভের ফুটবল-প্রেম শৈশব থেকেই।
স্থানীয় ক্লাব টিএসভি আখিমে খেলতে খেলতে ২০০৭ সালে ভেরডার ব্রেমেনের একাডেমিতে সুযোগ পান। তবে ২০১২ সালে ব্রেমেন তাঁকে দল থেকে বাদ দেন। কারণ, উনদাভের উচ্চতা কম।
ওই বয়সে ব্যাপারটা হজম করা কষ্টকর ছিল তাঁর জন্য। পরবর্তী সময়ে বেলজিয়ান সংবাদমাধ্যম সেভেন সুর সেভেনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উনদাভ বলেছিলেন, ‘ভেরডার (ব্রেমেন) যখন বলল, তাদের ওখানে আমার ভবিষ্যৎ নেই, খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। কিন্তু আমি আশা ছাড়িনি।’
উনদাভ আশা ছাড়েননি সত্যি, কিন্তু পথ ছিল বন্ধুর।
১৭ বছর বয়সে পরিবার ছেড়ে জার্মানির চতুর্থ বিভাগের ক্লাব টিএসভি হাভেলসায় যোগ দেন উনদাভ। নিচের স্তরের ক্লাব, ফুটবল থেকে আসা সামান্য পারিশ্রমিকে জীবন চলে না। তাই কারখানায় কাজ নেন উনদাভ, ‘দিনে আট ঘণ্টা লেজার মেশিন চালানোর কাজ করতাম। ঘুম থেকে উঠতাম ভোর ৪টার দিকে, কারখানায় যেতাম, তারপর অনুশীলনে। রাত ৮টার দিকে বাড়িতে ফিরতাম...পরের দিন আবার একইভাবে সব শুরু হতো।’
এরপর কয়েক বছর কেটে যায় জার্মানির নিচের স্তরের ফুটবলে। হাভেলসা, ব্রাউনশোয়াইগরন দ্বিতীয় দল, তারপর মেপেন। শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবল তখনো অনেক দূরের স্বপ্ন।
২০২০ সালে আসে মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। বেলজিয়ামের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব ইউনিয়ন সেন্ট-জিলোয়ায় যোগ দিলেন উনদাভ। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ। উনদাভও যেন নিজেকে আবিষ্কার করলেন নতুন রূপে। প্রথম মৌসুমেই ২৯ ম্যাচে ১৮ গোল, ইউনিয়ন এসজি উঠে গেল বেলজিয়ামের শীর্ষ লিগে। পরের বছর বেলজিয়ান প্রো লিগে করলেন ৩৯ ম্যাচে ২৬ গোল, জিতে নিলেন লিগের সেরা গোলদাতা আর সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। এরপর আর পেছনে তাকানোর কথা নয়। ব্রাইটন হয়ে স্টুটগার্টে এসে উনদাভ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন বুন্দেসলিগার অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড হিসেবে।
২০২৫-২৬ মৌসুমে করলেন ১৯ গোল, বুন্দেসলিগায় হ্যারি কেইনের পর দ্বিতীয়, জার্মানদের মধ্যে সর্বোচ্চ!
তবে উনদাভের জাতীয় দলের যাত্রাপথটা তেমন মসৃণ ছিল না। বিশেষ করে বিশ্বকাপের আগে।
গত মার্চে ঘানার বিপক্ষে বদলি নেমে জয়সূচক গোল করেছিলেন উনদাভ, এরপর প্রথম একাদশে খেলার ইচ্ছার কথা জানিয়ে ফেঁসে যান। কোচ ইউলিয়ান নাগেলসমান এমনও বলেছিলেন, শুরু থেকে মাঠে থাকলে হয়তো গোলটাই হতো না।
পরে অবশ্য নাগেলসমান এ নিয়ে দুঃখপ্রকাশও করেন। তবে দ্বন্দ্বের কারণে উনদাভ বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাবেন কি না, প্রশ্ন ছিল।
উনদাভ দলে জায়গা পেয়েছেন এবং কুরাসাওয়ের বিপক্ষে বদলি নেমে এক গোলের সঙ্গে দুই অ্যাসিস্ট, আইভরিকোস্টের বিপক্ষে জোড়া গোলে দলকে শেষ ৩২-এর টিকিটও এনে দিয়েছেন। ম্যাচের পর এক সাংবাদিক জার্মানি কোচকে জিজ্ঞাসা করেন, ইকুয়েডরের বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচে কি উনদাভ প্রথম একাদশে থাকতে পারেন?
নাগেলসমানের জবাব, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই।’
কয়েক মাস আগে দ্বিধায় থাকা কোচ এখন বলছেন, ‘কেন আমি তার গতি নষ্ট করব? সে প্রথম একাদশেও থাকতে পারে।’
২৯ বছর বয়সী উনদাভের জন্মদিন ১৯ জুলাই। কাকতালীয়ভাবে সেদিনই বিশ্বকাপ ফাইনাল।
১৪ বছর বয়সে যাঁকে বলা হয়েছিল, তাঁর উচ্চতা যথেষ্ট নয়, ১৭ বছর বয়সে যে ছেলেটি ভোর চারটায় উঠে কারখানায় যেতেন-তিনি কি জন্মদিনে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখতে পারেন?
উনদাভের গল্প বলছে, পারেন।
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...

-এ শুরু হয়েগেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল উৎসব ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই আসরকে ঘিরে ইতোমধ্যে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আমেজ।

বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপকে সামনে রেখে উন্মোচন করা হয়েছে অফিসিয়াল ম্যাচ বল ‘অ্যাডিডাস ট্রাইওন্ডা’। কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ আয়োজনে এই বিশ্বকাপের প্রতীকী উপস্থাপন হিসেবেই বলটির নকশা

ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, এটি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের আবেগ, উন্মাদনা এবং সংস্কৃতির এক মহা-উৎসব। আর এই উৎসবের পারদ যখন চড়তে চড়তে চরম সীমায় পৌঁছায়, তখন তাতে বাড়তি রঙ, সুর আর মোহময়তা যোগ করে সংগীত

সারা পৃথিবী এখন ফুটবল জ্বরে ভুগছে। জ্বর শব্দটা আতংকের। শারিরীক অসুস্থতার কারণে শরীরের জ্বর হয়। কিন্তু ফুটবল জ্বর আতংকের কোনো বিষয় নয়। বরং আনন্দ ও উৎসবের উপলক্ষ ফুটবল জ্বর। বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে গোটা

কখনও কখনও মনে হয় বাংলাদেশ যদি বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশগ্রহণের সুযোগ পায় তখন আনন্দ আর খুশির আতিশয্যে আসলে কি করবে বাংলাদেশের মানুষ? সারাদেশ আনন্দে মেতে উঠবে। আনন্দ-উৎসবের পর্যরদ সে কোথায় গিয়ে ঠেকাবে

সারাদেশ যখন বিশ্বকাপের আমেজ চলছে তখন ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার সমর্থকরা একটি শহরের একটি ক্লাব দখল করে নেয় এবং তারা নিজেরা একদল ক্লাবের নাম দেয় আর্জেন্টিনা ক্লাব আর একদল ক্লাবের নাম দেয় ব্রাজিল ক্লাব

নানাজনের নানান ধরনের মন্তব্য। কেউ কেউ অভিভূত। আবার কেউ কেউ অভিভূতের পাশাপাশি আনন্দে হতবাক। কারও কারও চোখে মুখে বিস্ময়। ফুটবলকে ভালোবেসে এমন আয়োজনও সম্ভব? হ্যা চ্যানেল আই এর পক্ষেই সম্ভব....

ফুটবল আর সংগীত-দুটি ভিন্ন জগৎ। কিন্তু বিশ্বকাপ এলে এই দুই জগৎ যেন একসুতোয় গাঁথা পড়ে। আর এবার সেই সংযোগকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাচ্ছে ফিফা।.....