Ad space

ফুটবলে বাংলাদেশের ইউরোপ জয়

প্রকাশ:
7
Image

সারা পৃথিবী এখন ফুটবল জ্বরে ভুগছে। জ্বর শব্দটা আতংকের। শারিরীক অসুস্থতার কারণে শরীরের জ্বর হয়। কিন্তু ফুটবল জ্বর আতংকের কোনো বিষয় নয়। বরং আনন্দ ও উৎসবের উপলক্ষ ফুটবল জ্বর। বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে গোটা পৃথিবীর মানুষের চোখ এখন রাত দিন টিভি পর্দায়। এবার যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকো তিন দেশ ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজন করেছে। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে নেই। কিন্তু ফুটবলকে ঘিরে উৎসব আনন্দের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশ বেশ এগিয়ে আছে। এবার ৪৮ দেশ বিশ্বকাপে খেলবে। বাংলাদেশে মূলত: দুটি দেশ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার ভক্ত সংখ্যা বেশি।

ফুটবল বিশ্বকাপের আগে ইউরোপের দেশ সান মারিনোর সঙ্গে সান মারিনোতেই বাংলাদেশ ফুটবল দল একটি ফুটবল ম্যাচে অংশ নেয়। বাংলাদেশ এই ম্যাচে জয় পেয়েছে। বাংলদেশ ২-১ গোলে সানমারিনোকে হারিয়েছে। ইউরোপের কোনো দেশের পক্ষে বাংলাদেশের এটাই প্রথম জয়। তাই বিশ্বকাপের এই সময়ে বাংলাদেশের ফুটবল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনায় উঠে এসেছে। একটি পত্রিকা লিখেছে- ‎সেরাভালের সান মারিনো স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তখন ইউরোপীয় বসন্তের হাওয়া, আর মাঠে যে ৯০ মিনিটের লড়াই চলল, তার প্রতিটি সেকেন্ড ছিল বাংলাদেশ ফুটবলের জন্য দারুণ রোমাঞ্চকর।

ইউরোপের কোনো দেশের বিপক্ষে প্রথম জয় (২-১), সঙ্গে বাংলাদেশের হয়ে কোচ টমাস ডুলির প্রথমবার ডাগআউটে দাঁড়ানো-সব মিলিয়ে সান মারিনোর বিপক্ষে গত রাতের প্রীতি ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য ছিল চেনা ছক ভেঙে এক অচেনা সাহসের গল্প লেখার মঞ্চ।

কোচ ডুলির একাদশ দেখেই বোঝা গিয়েছিল, রক্ষণভাগ সামলে সমতা খোঁজার চিরাচরিত এশিয়ান মানসিকতা নিয়ে তিনি দল মাঠে নামাননি। গোলরক্ষক মিতুল মারমাকে পোস্টের নিচে রেখে দলকে দাঁড় করিয়েছিলেন ৪-৩-৩ ফরমেশনে, যার মূল লক্ষ্যই আক্রমণ।

মাঝমাঠের খেলায় তিনি ভরসা রেখেছিলেন অভিজ্ঞ জামাল ভূঁইয়ার ওপর। জামালের উপস্থিতি দলকে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে যেমন সাহায্য করেছে, তেমনি আক্রমণভাগে থাকা রফিকুল, মোরছালিন ও ফাহিম প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে রেখেছেন ব্যতিব্যস্ত।

বাংলাদেশও স্রেফ কোনো আকস্মিক প্রতি-আক্রমণের ওপর ভিত্তি করে ম্যাচ জেতেনি; বরং বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পায়েই রেখেছে। পুরো ম্যাচে ৫৪ শতাংশ বলের দখল ধরে রাখা এবং ২৪৪টি সফল পাস খেলা সেই দক্ষতারই প্রমাণ।

ফুটবলে একটা কথা প্রচলিত আছে-ইউরোপীয় দলগুলোর সঙ্গে এশিয়ার দলগুলো ফিজিক্যালিটি বা শারীরিক শক্তিতে পেরে ওঠে না। বিশেষ করে সেট-পিস কিংবা শূন্যে ভেসে আসা বলের লড়াইয়ে তারা সব সময়ই লম্বা গড়ন আর শারীরিক শক্তির কারণে এগিয়ে থাকে।

কিন্তু কাল সান মারিনোকে তাদের নিজেদের এ সেরা অস্ত্রেই কুপোকাত করেছে বাংলাদেশ। যেখানে নায়ক ডিফেন্ডার তপু বর্মণ। ম্যাচের ১৯ মিনিটে যখন বাংলাদেশ প্রথম লিড নেয়, সেটি ছিল সেট-পিসের এক দারুণ ফসল। ডুলির দল পুরো ম্যাচে কর্নার পেয়েছিল মাত্র দুটি, কিন্তু সেই সীমিত সুযোগেরই সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছেন তপু।

৮৬ মিনিটে ম্যাচ ১-১ গোলে সমতা, ড্রয়ের দিকে যাচ্ছিল ম্যাচ, তখনই আবার ত্রাতা বনে যান তপু, প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের মাথার ওপর দিয়ে তপুর নেওয়া নিখুঁত হেডটি খুঁজে নেয় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য। সব মিলিয়ে বলা যায়, বাতাসে ভেসে আসা বলে ইউরোপীয় ডিফেন্ডারদের দারুণভাবে পরাস্ত করেছে বাংলাদেশ।

‎অবশ্য প্রথমার্ধের ৩১ মিনিটে জিয়াকোপেত্তির গোলে সান মারিনো যখন সমতায় ফেরে, তখন বাংলাদেশ ড্রেসিংরুমে ভর করেছিল দুশ্চিন্তা। বিরতির পর কোচ ডুলির পরিকল্পনায় সেই দুশ্চিন্তা আর থাকেনি। দ্বিতীয়ার্ধে একাদশে তিনি ৬টি পরিবর্তন আনেন।

ফুটবলীয় পরিভাষায় এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলেও ডুলির এই কুশলী নীতি বাংলাদেশের আক্রমণকে করেছে আরও গতিশীল। বদলি নামা খেলোয়াড়েরা মাঠে হাই প্রেসিং ফুটবলটা সচল রাখেন, যার ফলে সান মারিনোর ক্লান্ত রক্ষণভাগ ক্রমাগত ভুল করতে বাধ্য হয়।

মেসিরা বিশ্বকাপ জেতার পর গত চার বছরে ফুটবল দুনিয়ায় কী পরিবর্তন ঘটেছে

বাংলাদেশ রক্ষণভাগও এই সময় দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল-৩৪ বার বলের পুনর্দখল নেওয়া, ১২টি সফল ট্যাকল ও ২০টি ‘ক্লিয়ারেন্স’ প্রমাণ করে যে লিড ধরে রাখতে কতটা মরিয়া ছিলেন হামজারা।

Image

শেষ বাঁশি বাজার পর তাই খেলোয়াড়দের উল্লাসটা শুধু একটি জয়ের ছিল না, সেটি ডুলির আধুনিক ফুটবল-দর্শনের সঙ্গে বাংলাদেশের ফুটবলারদের নিখুঁত মেলবন্ধনের এক সার্থক উদ্‌যাপনও। গ্যালারীতে প্রবাসী বাঙালিদের এই বাঁধভাঙা উল্লাস আর ভালোবাসার দিনে ইউরোপ জয়ের গল্প লিখেছে বাংলাদেশ ফুটবল দল। তপু বর্মণের জোড়া গোলে ফিফা প্রীতি ম্যাচে সান মারিনোকে ২-১ গোলে হারিয়েছে হামজা-জামালদের বাংলাদেশ। এটি ইউরোপের মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম জয়।

এর আগে ২০০১ সালে সাহারা কাপে যুগোস্লাভিয়া এবং বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে একটি করে ম্যাচ খেলেছিল বাংলাদেশ, তবে সেই দুটি ম্যাচেই হার নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল। ফলে সান মারিনোর বিপক্ষে এই ম্যাচটি ছিল নিজেদের নতুন করে চেনানোর এক বড় মঞ্চ। নিজেকে চেনানোর চ্যালেঞ্জ ছিল টমাস ডুলিরও।

বাংলাদেশ দলের নতুন কোচ কালই প্রথম ডাগআউটে দাঁড়িয়েছেন। প্রথম ম্যাচে তিনি দল সাজিয়েছেন ৪-৩-৩ ফরমেশনে। যার মধ্যে বড় পরিবর্তন ছিল মাঝমাঠে। কানাডাপ্রবাসী মিডফিল্ডার শমিত সোমকে শুরুর একাদশে না রেখে অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া ও সোহেল রানাকে খেলান হামজা চৌধুরীর সঙ্গী হিসেবে।

ম্যাচের প্রথম ১০ মিনিট অবশ্য বাংলাদেশের জন্য খুব একটা সহজ ছিল না। স্বাগতিকদের কন্ডিশনে মানিয়ে নিতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গুছিয়ে উঠে সান মারিনোর রক্ষণভাগে চাপ বাড়াতে শুরু করে বাংলাদেশ। যার ফল মেলে দ্রুতই, ম্যাচের ১৯ মিনিটে। ডান প্রান্ত থেকে শেখ মোরছালিনের বাড়ানো লম্বা ক্রসে দারুণ হেডে বল জালে জড়ান তপু বর্মণ।

Image

গোল হজমের পর ম্যাচে ফিরতে মরিয়া হয়ে ওঠে সান মারিনো। স্বাগতিকদের সেই মরিয়া প্রচেষ্টা সফল হয় ৩১ মিনিটে। দারুণ এক গতিময় আক্রমণ থেকে সমতা ফেরায় তারা। সান মারিনোর ২৯ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড ফিলিপ্পো বেরার্ডির পাস থেকে চমৎকার গোলটি করেন নিকোলাস জিয়াকোপেটি। বাংলাদেশের গোলকিপার মিতুল মারমা ডান দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলে স্পর্শ করলেও জালে যাওয়া থামাতে পারেননি।

ম্যাচে সমতা আসার ঠিক ছয় মিনিট পরই আবারও লিড নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু প্রতিপক্ষের গোলকিপারকে একদম একা পেয়েও লক্ষ্যভেদ করতে পারেননি সাদ উদ্দিন।

দ্বিতীয়ার্ধে দলের শক্তি ও কৌশল পরীক্ষা করতে একাদশে ছয়টি পরিবর্তন আনেন বাংলাদেশ কোচ। রক্ষণভাগের ইসা ফয়সালকে উঠিয়ে নামানো হয় জায়ান আহমেদকে, মাঝমাঠে জামালের বদলে নামেন শমিত সোম, মোরছালিনের জায়গায় মাঠে নামেন সোহেল রানা জুনিয়র। ম্যাচের ৬০ মিনিটে বিশ্বনাথ ঘোষ ও ফাহামিদুল ইসলাম এবং ৭৫ মিনিটে কাজেম শাহকেও খেলার সুযোগ দেন ডুলি। তাতে বাংলাদেশের আক্রমণেও গতি ফেরে।

ম্যাচের শেষ দিকে, ঠিক ৮৬ মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। হামজার নেওয়া ফ্রি-কিক থেকে গোলমুখে শট নেন বিশ্বনাথ ঘোষ। আর সেই শটে মাথা এগিয়ে দিয়ে বল জালে পাঠান তপু। এটি জাতীয় দলের হয়ে তাঁর অষ্টম গোল। শেষ পর্যন্ত এই ব্যবধান ধরে রেখে হাসিমুখে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ।

আগেই বলেছি বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ফুটবলে নেই। তবে আলোচনায় আছে বাংলাদেশ। ফুটবল বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী অনেক দেশের খেলোয়াড়দের জার্সি বানিয়েছে বাংলাদেশ। গোটা বাংলাদেশ এখন ফুটবল আনন্দের বিভোর। ফুটবলে প্রিয় দেশের পতাকা হাতে ও জার্সি শরীরে চাপিয়ে নিয়ে মিছিল হচ্ছে প্রায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও। মূলত: আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থনেই দেশের ফুটবল প্রেমী দর্শক উৎসব আনন্দে মশগুল। বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজনে ভুরি ভোজের ব্যবস্থাও থাকছে।

আনন্দের এমন সময়েও কিছু প্রয়োজনীয় কথা বলতে চাই্ একটু ফ্লাশ ব্যাকে যেতে চাই...

Image

গুলিস্তান থেকে বায়তুল মোকারম জাতীয় মসজিদ এলাকা লোকে লোকারন্য। রাস্তায় সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ যানজট। তবুও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসছে মানুষ। সবার গন্তব্য পাশের গুলোর সামনে জাতীয় স্টেডিয়াম। একটু পরেই আবাহনী ও মোহামেডানের মধ্যে ফুটবল দ্বৈরথ শুরু হবে। টিকিট কাউন্টার লম্বা লাইন। ইতিমধ্যে মাঠের সবকটি গ্যালারীর আসন দখল হয়েছে। কোথাও তিল ধারনের ঠাই নেই। তবুও ¯্রােতের মতো আসছে মানুষ। কোনো মতে দাঁড়িয়ে থেকে খেলা দেখা যায় কিনা তারই আপ্রাণ চেষ্টা। নির্ধারিত সময়ে খেলা শুরু হয়ে গেল। আবাহনী অথবা মোহামেডান যে দলই প্রতিপক্ষের গোলপোস্টের দিকে বল নিয়ে যাচ্ছে দেখে আনন্দ আর হৈচৈ এ ফেটে পড়ছে গোটা স্টেডিয়াম। গো...ও...ল বলে গগণ বিদারী চিৎকার হচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে... একই সময়ে মাঠের বাইরে অপেক্ষমান হাজার হাজার দর্শক টিকিট না পাবার আক্ষেপ ঘোচাতে মাঠের গ্যালারী থেকে ভেসে আসা হৈ চৈ আর গো... ও... ল হর্ষধ্বনির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আনন্দ করছে। একদা ফুটবল এতটাই প্রিয় ছিল দেশের মানুষের কাছে।

এতো গেল ঢাকার কথা। ঢাকার বাইরেও দেশের প্রতিটি জেলা উপজেলা শহর এমন কি ইউনিয়ন পর্যায়েও ফুটবল টুর্নামেন্টকে ঘিরে সারা বছর আনন্দ উৎসবের রেশ লেগেই থাকতো। জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়রা ছিল সবার আদর ও ভালোবাসার মানুষ। স্থানীয় পর্যায়ের ফুটবল খেলোয়াড়দের মান মর্যাদাও ছিল বিশেষ ভাবে উল্লেখ করার মতো। ঢাকার বাইরের টুর্নামেন্ট গুলোতে ঢাকার অর্থাৎ জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা বিশেষ চুক্তির আওতায় খেলতে যেতেন। তাদেরকে এক নজর দেখার জন্য ফুটবল প্রেমীদের ভীড় জমে যেতো। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নিতে হতো।

ঢাকার ফুটবল ক্লাব গুলো ছিল বেশ সক্রিয়। বছরের একটা সময়ে ফুটবলার কেনা-বেচার মহোৎসব হতো। পারিশ্রমিক বৃদ্ধির কৌশলে একদলের নামকরা খেলোয়াড় অন্যদলে চলে যেতেন। এনিয়ে প্রচার মাধ্যম বেশ সরগরম হয়ে উঠতো। কোন ক্লাবের কোন খেলোয়াড় কত টাকার চুক্তিতে দল বদল করলেন তাই নিয়ে চমকপ্রদ খবর থাকতো বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায়। সারা বছরই ফুটবল থাকতো আলোচনায়।

অথচ হঠাৎ করেই যেন দেশের ফুটবল আলোচনার বাইরে চলে গেল। একটা সময় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হল যে আবাহনী, মোহামেডানের মধ্যে ফুটবল লড়াই দেখার ব্যাপারেও ক্রীড়া প্রেমীদের কোনো আগ্রহ নাই। আগে টিকিটের জন্য ছিল হাহাকার। এখন ফ্রিতে খেলা দেখার সুযোগ দিয়েও দর্শক পাওয়া যায় না। কেন এই দুরাবস্থা?

অনেকেই ক্রিকেটের উত্থানকে এজন্য দায়ী করেন। তাদের ধারনা ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি একটা সময় ফুটবলের জনপ্রিয়তাকে ম্লান করে দেয়। একজন নামকরা ক্রীড়াবিদ উদাহরণ দিতে গিয়ে বললেন, ধরা যাক আপনার পরিবারে দুটি সন্তান। একজনের নাম মনির অন্যজনের নাম পনির। মনির বড়। পনির ছোট। মনিরের জন্মের পর গোটা পরিবার তাকে নিয়েই ব্যস্ত ছিল। কিন্তু পনিরের জন্মের পর দেখা গেল মনিরের চেয়ে সে একটু মেধাবী। পড়ালেখায় মনিরের চেয়ে ভালো। পরিবারের সবাই পনিরের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠলো। মনিরের প্রতি কারও কোনো আগ্রহ নাই। ফলে অথতœ অবহেলায় বড় ভাই মনিরের মেধা ও শক্তি কমে যেতে থাকলো।

অনেকের মতে, ফুটবলের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ক্রিকেটকে ফুটবলের চেয়েও গুরুত্বপুর্ন করে তোলে। ক্রিকেট যতটা যতেœর বিষয় হয় ফুটবল ততটাই অযতেœর হয়ে ওঠে। ফলে দেশে ফুটবলের ঐতিহ্য দিনে দিনে ম্লান হতে শুরু করে। যদিও এই যুক্তি পুরোটাই মেনে নেওয়ার মতো নয়। ফুটবল এবং ক্রিকেট দুটি খেলার জন্যই পৃথক পৃথক বোর্ড অর্থাৎ নেতৃত্বদানকারী প্রতিষ্ঠান আছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নেতৃত্বে দেশের ক্রিকেট পরিচালিত হয়। আর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নেতৃত্বে দেশের ফুটবল পরিচালিত হয়। কাজেই অযতœ, অবহেলার প্রশ্ন সঠিক নয় বলে অনেকে মনে করেন।

Image

তর্কে যাব না। বাংলাদেশের মানুষ ফুটবলের প্রতি কতটা অনুরক্ত তার প্রমাণ মেলে প্রতি চার বছর পর পর। বিশ্বকাপ ফুটবলে বাংলাদেশের তো কোনো সম্পৃক্ত নেই। অথচ ফুটবল উম্মাদনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত দেশ। একটি গুরুত্বপুর্ন প্রসঙ্গ তুলে ধরতে চাই। বাংলাদেশের অধিকাংশ ফুটবলপ্রেমী মানুষ দেশের জাতীয় ফুটবল দলের ক্যাপ্টেনের নাম বলতে পারবে না। যদিও হামজারা দলে যুক্ত হবার পর পরিস্থিতি কিছুটা পাল্টেছে। বাংলাদেশের ক্রীড়া মোদি মানুষেরা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ফুটবল খেলোয়াড়দের অনেকের নাম জানে। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা তো বাংলাদেশের ফুটবল প্রেমী মানুষকে রীতিমতো দুই ভাগে বিভক্ত করে তুলেছে। অতীতের মতো এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমী মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। এক ভাগে ব্রাজিল অন্যভাগে আর্জন্টিনা। জার্মানীর সমর্থকও আছে। বাংলাদেশ মানুষও তো ফুটবল খেলে। আর কতদিন বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ফুটবলের শুধুমাত্র দর্শক হয়েই থাকবে?

বিশ্বকাপ ফুটবল তো অনেক দূরের পথ। এশিয়ায় বাংলাদেশের ফুটবলের অবস্থান কি আশাব্যঞ্জক? দেশে ফুটবলই একটা সময় সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ছিল। কেন দেশের ফুটবল হঠাৎ জনপ্রিয়তা হারাল? একটা সময় ঢাকা সহ দেশের অনেক জেলা শহরের ফুটবল ক্লাব গুলো অনেক সক্রিয় ছিল। এখন কেন ক্লাব গুলোর সেই অর্থে ফুটবলকে ঘিরে তেমন কোনো পজিটিভ কর্মকান্ড নেই? এই প্রশ্নের উত্তর কি জানি আমরা? জানলেও কার্যকর সিদ্ধান্ত কি নেই?

আশার কথা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্রীড়া ক্ষেত্রে কিছু উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ নিয়েছেন। পাঠ্য পুস্তকে ৭টি খেলাকে পঠন-পাঠনের আওতায় আনা হয়েছে। বার্ষিক পরীক্ষায় ক্রীড়ার এই বিষয়গুলো পাস ফেলের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে। বিটিভির নতুন কুড়ির অনুকরণে ক্রীড়া ক্ষেত্রে ক্ষুদে ফুটবলরেদের খোঁজ বের করতে ‘নতুন কুড়ি’ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। আমরা তো আশা করতেই পারি ফুটবলের ক্ষেত্রে এই ‘নতুন কুড়ি’ কার্যক্রমটিই একদিন কাঙ্খিত স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটাবে।

এই লেখাটি যখন লিখছি তখন প্রচার মাধ্যমে খবর বেরিয়েছে ভারতের গোয়ায় অনুষ্ঠিত সাফ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়ন শীপে নেপালকে হারিয়ে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল টানা তৃতীয়বারের মতো ফাইনালে উঠেছে। কখনও কখনও মনে প্রশ্ন জাগে সীমিত সুযোগ সুবিধার মধ্যেও নারী ফুটবল দল নিজেদের প্রতিভার স্ফুরণ ঘটিয়ে চলেছে। সেই তুলনায় জাতীয় ফুটবল দল কি সঠিক পথে এগুচ্ছে? কার কাছ থেকে এই প্রশ্নের জবাব খুঁজবো?

যদিও এটি একটি অলীক স্বপ্ন। তবুও স্বপ্নের কথাটি বলতে চাই। ফুটবল ব্যাংকিং এ বাংলাদেশের অবস্থান অনেক নীচে। কাজেই কবে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ফুটবল অংশ নিতে পারবে তা কল্পনা করাও সাহসের ব্যাপার। কিন্তু এনিয়ে কি আমাদের কোনো সুদুর প্রসারী কোনো পরিকল্পনা আছে? ইউরোপের একটি ছেঅট দেশকে ফুটবলে হারিয়ে দেবার পর বাংলাদেশের ফুটবল প্রেমী মানুষ যেভাবে আনন্দ জোয়ারে আসছে... এমন পরিুস্থিতিতে ভাবুন তো একবার বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশ নেয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। কী ঘটবে বাংলাদেশে? গোটা বাংলাদেশে একযোগে আনন্দ উৎসবের ঢেউ দেখা দিবে। আনন্দে দেশের মানুষ কত কি যে করবে... ভাবতে কি যে আনন্দ হচ্ছে। কী শান্তি! কী শান্তি! কী শান্তি!!!

হাতি-গরিলাদের ভবিষ্যদ্বাণী, চিড়িয়াখানায় বিশ্বকাপ উন্মাদনা

২০২৬ বিশ্বকাপে উদ্বোধনী ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে এক অদ্ভুত কা-ই ঘটে গেল মেক্সিকোর গুয়াদালাহারা চিড়িয়াখানায়। সেখানকার একটি অস্থায়ী ফুটবল মাঠে ধীরপায়ে হেঁটে গিয়ে এই ম্যাচ নিয়ে অদ্ভুতুড়ে ভবিষ্যদ্বাণী করার চেষ্টা করেছে দুটি হাতি।

হাতি দুটির সামনে ছিল দুটি পথ। তাদের বেছে নিতে হতো যেকোনো এক দিকের খাবার-একপাশে ছিল মেক্সিকোর পতাকা লাগানো ঘাস, আর অন্যপাশে প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকার সবুজ পাতা।

মুহূর্তের ভাবনায় তারা মেক্সিকোর পতাকার দিকেই হেঁটে যায়। আর তাতেই জোরালো হলো পূর্বাভাস-১১ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মেক্সিকোই জিতবে।

প্রাণীদের দিয়ে ম্যাচের ফল অনুমান করানোর এই আয়োজন ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে অবিস্মরণীয় ‘জ্যোতিষী’ অক্টোপাস ‘পল’-এর স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।

গুয়াদালাহারা চিড়িয়াখানার কিপার ইভান রেইনোসো এএফপিকে বলেন, ‘মূল ভাবনাটি হলো, বিশ্বকাপের বিভিন্ন ম্যাচ নিয়ে এই প্রাণীরা তাদের মতো করে ভবিষ্যদ্বাণী করবে।’

হাতিদের পর্ব শেষ হতেই হাজির করা হয় ‘চেনচি’ ও ‘ফাউস্তিনা’ নামে দুটি গরিলাকে। তাদের সামনে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় ফুটবলারদের জার্সির আদলে তৈরি দুটি ‘পিনিয়াতা’ (খাবার বা খেলনা ভরা রঙিন পাত্র) একটি স্পেনের, অন্যটি উরুগুয়ের। হঠাৎ করেই একটি গরিলা উরুগুয়ের জার্সির দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এর অর্থ হলো-২৬ জুন গ্রুপ পর্বে এ দুই দলের মধ্যকার ম্যাচে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ উরুগুয়েই শেষ হাসি হাসবে। এটা দেখে একজন কিপার উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে ওঠেন, ‘কে জিতেছে তা তো পরিষ্কার দেখাই যাচ্ছে!’

তবে এখানেই শেষ নয়, ‘মুলুক’ নামে এক পুমা (চিতাবাঘসদৃশ বন্য বিড়াল) নিশ্চিত যে বিশ্বকাপে ‘সি’ গ্রুপের ম্যাচে চেক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে দক্ষিণ কোরিয়াই জিতবে। অন্যদিকে ছয়টি জিরাফ কলম্বিয়াকে হারিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোর জয়ের পূর্বাভাস দিয়েছে।

রেইনোসো জানান, বিশ্বকাপ ঘিরে দর্শকদের বিনোদন দেওয়ার পাশাপাশি এই আয়োজন প্রাণীদেরও বেশ চাঙা রাখছে। তাঁর ভাষায়, ‘এ ধরনের কর্মকা- প্রাণীদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে দারুণ সাহায্য করে। এটি শুধু দর্শকদের চোখের আনন্দই দিচ্ছে না, প্রাণীদের জন্যও ভীষণ উপকারী।’

আরও পড়ুন

লোড হচ্ছে...