Ad space

ব্যন্ডের গানের প্রতি কেন এতো আক্রোশ?

প্রকাশ:
37
Image

সংস্কৃতি সরিয়ে নিলে রাজনীতি টিকবে কীভাবে?

শেখ সাদী খান

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই দেখছি, আমরা একে অন্যকে খোঁচাখুঁচি করার রাজনীতি করছি। কিন্তু সবাই মিলে দেশের জন্য কীভাবে কি করা যায়, দেশটাকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়-সেই জায়গায় আমাদের চিন্তাভাবনা খুব একটা নেই। এই প্রবণতা বন্ধ হওয়া উচিত। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো সংগীতসমৃদ্ধ একটি জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধের সাম্প্রতিক ঘটনাটি পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। আমি মনে করি, সংস্কৃতি যদি আমাদের দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তাহলে রাজনীতি টিকবে কীভাবে? রাজনীতির সঙ্গে সংস্কৃতির একটি সুন্দর মেলবন্ধন ও সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। কারণ, প্রত্যেক জাতিরই নিজস্ব সংস্কৃতি আছে, আর সেই সংস্কৃতিই জাতির পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি।

সাংস্কৃতিক কর্মকা- নিয়ে কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা মহলের উগ্র আচরণ দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। গত কয়েক বছরের সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে বাধা দেওয়ার ঘটনাগুলো যদি আমরা দেখি, তাহলে দেখা যাবে, কিছু উগ্রপন্থী মানুষই এসবের পেছনে জড়িত। তারা সংস্কৃতিকে ঘিরে একধরনের ঘৃণা ছড়ানোর চেষ্টা করছে।

আমার জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ লাইনে উচ্চ শব্দের কারণ দেখিয়ে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনার কথা শুনেছি। আমার প্রশ্ন হলো, যদি শব্দ নিয়ে আপত্তি থাকে, তাহলে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া কেন? শব্দ কমিয়ে অনুষ্ঠান করার সুযোগ করে দেওয়াটাই তো আসল দায়িত্ব ছিল। সমাধান করতে হবে, সংস্কৃতির পথ বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমাধান নয়।

Image

বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী আসিফ আকবর বলেছেন, আমাদেরকে নিশ্চিত হতে হবে যে, এই দেশে গান বাজনা হবে কি হবেনা। সরকারকেই এটা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় শিল্পীরা তো দেশে থাকবে না। দেশ একটা সময় শিল্পী শূন্য হয়ে যাবে। আমরা কি সেটা চাই? সরকারকেই এই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা গেল একদল টুপি পরা মানুষ বীর বিক্রমে প্রথমে হারমোনিয়াম, ডুগি তবলা সহ আরও কিছূ বাদ্যযন্ত্র ভাঙ্গচুর করলো। দেখে মনে হচ্ছে হারমোনিয়াম আর ডুগি তবলার উপর তাদের অনেক আক্রোশ। যার যতটুকু শক্তি আছে তাই দিয়ে বাদ্যযন্ত্র গুলোকে লাথি দিচ্ছে। ভাঙ্গচুর করছে। একটা সময় ভাঙ্গচুর করা বাদ্যযন্ত্রে কেরোসিন ঢেলে ম্যাচের কাঠি জ্বেলে আগুন ধরিয়ে দিল। দাউ দাউ করে জ্বলছে হারমোনিয়াম, ডুগি, তবলা। পুড়ে যাচ্ছে  দেশের সংস্কৃতি। দারুন উল্লাস করছে টুপি পরা লোক গুলো।

এখন প্রশ্ন হলো টুপি পরা সব লোকই কি চান দেশের গান বাজনা না থাকুক? না ঠিক তা নয়।  দেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ চায় দেশে গান বাজনা অর্থাৎ সংস্কৃতির বিকাশ ভাবনার সব ক্ষেত্রই সচল থাকুক। অথচ মুষ্টিমেয় উগ্রবাদী লোকের কারণে দেশের সংস্কৃতির বিকাশ বাধা গ্রস্থ হচ্ছে। তারা যখন খুশি তখন সংস্কৃতি কর্মীদের উপর চড়াও হচ্ছে। মব সৃষ্টি করে আতংক ছড়াচ্ছে। কিশোরগঞ্জ ও ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ায় ব্যান্ডের দুটি অনুষ্ঠানে বাধা প্রদান করাা হয়েছে। ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ায় পুলিশ কর্মকর্তা, কর্মচারীদের আয়োজনে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্টান করতে দেয়নি। ভাবা যায়, পুলিশের অনুষ্ঠান। সেটাও উগ্রবাদীদের দ্বারা বাধাগ্রস্থ হল। তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কতাটা ঝুকিপুর্ন তা সহজেই অনুমেয়। 

ব্যান্ড সঙ্গীত আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। অথচ সাম্প্রতিক কালে ব্যান্ড সঙ্গীতের উপর অনেক বাধা আসছে। সরকারের অনুমতি ছাড়া যখন তখন ব্যান্ড সঙ্গীদের আয়োজন করা যাবে না। এখানেও উগ্রবাদীরা দাবার গুটি নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের হুুমকি, হুশিয়ারীর কারনেই মূলতঃ ব্যান্ড সঙ্গীত বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। সে কারনেই বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী আসিফ আকবর প্রশ্ন তুলেছেন, এই দেশে গান বাজনা কি নিষিদ্ধ? সরকারের কাছে  জবাব চেয়েছেন তিনি।

এ ব্যাপারে দেশের কয়েকজন গুনি শিল্পী কথা বলেছেন! আসুন দেখি কে কি বলেছে।

সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড স্বাভাবিকভাবে চলতে দিতে হবে

সাবিনা ইয়াসমীন

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে, নানা ঘটনায় শিল্পীদের ক্ষতি হয়েছে। শুধু শিল্পী নন, যন্ত্রশিল্পী, আয়োজকসহ সংশ্লিষ্ট সবারই আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। গান কিংবা কোনো অনুষ্ঠান কারও পছন্দ না হলে সেটি না দেখার অধিকার তাঁর অবশ্যই আছে। কিন্তু পছন্দ নয় বলে একটি অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। সরকারের কোনো সংস্থার যদি কোনো অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি থাকে, তাহলে সেটি শুরুতেই জানানো উচিত। আয়োজনের আগে বলা যেতে পারে-এখানে কনসার্ট করা যাবে না। কিন্তু সব প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর হঠাৎ করে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিলে শুধু শিল্পী নন, আয়োজক থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সবারই বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।

পাশাপাশি এ ধরনের ঘটনা শিল্পচর্চার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

আমি দীর্ঘ সময় ধরে দেশের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন দেখছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এ ধরনের ঘটনা সত্যিই গভীরভাবে উদ্বেগের। হঠাৎ করে এভাবে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার প্রবণতা চলতে থাকলে শিল্পীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও হতাশা তৈরি হবে।

সরকারের কাছে আমার চাওয়া খুব পরিষ্কার-গানবাজনা ও সাংস্কৃতিক কর্মকা- স্বাভাবিকভাবে চলতে দিতে হবে। অবশ্যই সেখানে কোনো ধরনের নোংরামি বা অনিয়ম থাকবে না; সবকিছু স্বচ্ছ, সুন্দর ও শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে হবে। কিন্তু গানবাজনা বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমাধান হতে পারে না।

গানবাজনা একটি দেশের সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের মানুষের আবেগ ও জীবনযাপনের সঙ্গে সংগীত ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তাই এটিকে বন্ধ করে দেওয়া যাবে না। বরং রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে সাংস্কৃতিক কর্মকা- যাতে সুন্দর, নিরাপদ ও নির্বিঘœভাবে চলতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা।

সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে যারা বাধা দিচ্ছে-রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তাদের বিষয়ে একটি পরিষ্কার ও কঠোর বার্তা দেওয়া দরকার। যাতে সবাই বুঝতে পারে-মতপার্থক্য বা ব্যক্তিগত অপছন্দ থাকতে পারে, কিন্তু কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তি নিজের ইচ্ছায় একটি কনসার্ট বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিতে পারবে না।

সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে

হামিন আহমেদ

Image

নিবন্ধন ছিল কি না-শেষ মুহূর্তে এ ধরনের উদ্ভট কারণ সামনে এনে কনসার্ট বাতিল করা আসল ঘটনাকে আড়াল করারই একটি প্রয়াস বলে আমি মনে করি। মূল বিষয় হচ্ছে, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ কনসার্ট বাতিল-আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এমনটা অনেক দেখেছি। তখন শিল্পীদের গায়ে হাত তোলা হয়েছে, চুল কেটে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু এসব ঘটনায় দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে আজ নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থায় এসে সেই গোষ্ঠী আরও উৎসাহী হয়ে সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে। একে আমি একধরনের প্রশ্রয় হিসেবেই দেখি। প্রশ্রয় পেয়ে এ ধরনের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জে এ ধরনের পরিস্থিতি এক-দুই মাসে তৈরি হয়নি। গত কয়েক বছরে ধীরে ধীরে বিষয়টি বড় আকার ধারণ করেছে। তাই এখনই এর লাগাম টেনে ধরা প্রয়োজন।

সরকারের কাছে আমার দাবি খুব পরিষ্কার-কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর দ্রুত, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে এবং তদন্তের ভিত্তিতে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পুলিশ, থানা বা জেলা প্রশাসন যদি কোনো এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, যদি কোনো সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী থানায় ঢুকে মব তৈরি করে একটি অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিতে পারে, তাহলে সেই থানা কীভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করছে-সেই প্রশ্নও তুলতে হবে।

প্রধান কথা হলো, সব পেশার মানুষ যদি নির্বিঘেœ কাজ করতে পারেন, তাহলে শুধু সংগীতের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের কেন এ ধরনের হয়রানি ও হামলার শিকার হতে হবে? এসব ঘটনা কি শুধু সংবাদমাধ্যমে খবর হবে, আমরা শিল্পীরা কথা বলব, দু-একজন বড় ব্যক্তিত্ব প্রতিবাদ করবেন-তারপর সব শেষ? তা হতে পারে না। সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

কোনো গোষ্ঠী আপত্তি করলেই বা হুমকি দিলেই প্রশাসনের দায়িত্ব অনুষ্ঠান বাতিল করে দেওয়া নয়। বরং অনুষ্ঠানটি শিল্পী, আয়োজক ও দর্শকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সেটি নির্বিঘেœ করাটাই প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব।

যে সরকার সংস্কৃতিমনা এবং চায় সংস্কৃতি ও সংগীত তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক, তারা ভালো ও সৃজনশীল কর্মকা-ের সঙ্গে যুক্ত হোক-তাদের কাছে এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত। বিএনপি সব সময় ব্যান্ড মিউজিকসহ বিভিন্ন ধরনের সংগীতকে সমর্থন করে এসেছে। এবার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও সংগীতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই জায়গা থেকে সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা আরও বেশি। কারণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশঙ্কা দেখিয়ে যদি কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে যেকোনো গোষ্ঠী শুধু আপত্তি বা হুমকি দিয়েই একটি অনুষ্ঠান বন্ধ করিয়ে দেওয়ার সুযোগ পাবে। এটি আরও বড় ধরনের প্রশ্রয়ের পথ তৈরি করবে।

Image

আমি চাই সারাদেশে নির্বিঘেœ সাংস্কৃতিক চর্চা অব্যাহত থাকুক

বেবী নাজনীন

আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গন যদি ধীরে ধীরে কলাপস করে যায়, তাহলে অন্যদিক দিয়ে দেশের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোও কঠিন হয়ে পড়বে। সংস্কৃতি একটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। আমাদের সরকার নতুন এসেছে, তবে তারা সংস্কৃতিবান্ধব। ম্যাডাম খালেদা জিয়া সংস্কৃতিকে ভীষণ ভালোবাসতেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও ছিলেন একজন ট্যালেন্ট হান্টার। তিনিই আমাকে খুঁজে নিয়ে এসেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সংস্কৃতির মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন করতে চান। তাঁর চিন্তায় সংস্কৃতি একটি বড় জায়গাজুড়ে আছে।

কিন্তু কনসার্ট বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনা বারবার ঘটতে থাকলে শিল্পীরা নিরুৎসাহিত হবেন। আর আমার মনে হয়, উগ্র গোষ্ঠীগুলোর উদ্দেশ্যও হয়তো সেটিই-শিল্পীদের ভয় দেখানো, নিরুৎসাহিত করা এবং একসময় তাঁদের কাজকর্ম বন্ধ করে দেওয়া। অথচ শিল্পীদের প্রধান আয়ের জায়গাগুলোর একটি হলো সারা দেশের কনসার্ট। তাই কনসার্ট ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য একটি নির্বিঘœ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতে সরকার ও তার সংস্থাগুলোর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।

আমার কেন জানি মনে হয়, সরকারের উন্নয়ন কর্মকা-কে প্রশ্নবিদ্ধ করতে কোনো কোনো উগ্র গোষ্ঠী এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করছে। একজন শিল্পী যেন তাঁর কাজ করতে পারেন, একজন খেলোয়াড়েরও তা-ই-একজন কবি, সাহিত্যিক, স্থপতি কিংবা অন্য পেশার মানুষ যেন নিরাপদে ও স্বাধীনভাবে তাঁদের পেশাগত চর্চা ও দায়িত্ব পালন করতে পারেন-সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দেশটা সবার। তাই সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রত্যেক মানুষ যেন তাঁর পেশাগত দায়িত্ব সুন্দরভাবে পালন করতে পারেন, সেই কর্মপরিবেশও সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।

আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষ বিএনপি সরকারকে ক্ষমতায় এনেছে। এখন কোনো গোষ্ঠী হয়তো সরকারের কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করতে কিংবা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে পারে। এসব ঘটনার মাধ্যমে সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলারও চেষ্টা থাকতে পারে। তাই সরকারের উচিত প্রতিটি ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তাৎক্ষণিক তদন্ত করা এবং তদন্তের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া।

আমি চাই, সারা দেশে নির্বিঘেœ সাংস্কৃতিক চর্চা অব্যাহত থাকুক। শিল্পীরা যেন ভয় বা অনিশ্চয়তার মধ্যে না থাকেন। সংস্কৃতির মানুষ যেন তাঁদের কাজ করে যেতে পারেন-এমন একটি নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

আমার সাংস্কৃতিক অধিকারে কেন আঘাত আসবে?

নাজমুন মুনিরা ন্যান্‌সি

কনসার্ট একজন শিল্পীর আয়ের প্রধান জায়গা। শুরুতে গান একজন শিল্পীর নেশা থাকে, পরে সেটিই পেশায় পরিণত হয়। সেই পেশাকে সামনে রেখেই একজন শিল্পী এগিয়ে যান। তাই হঠাৎ করে একটি কনসার্ট বাতিল হয়ে যাওয়া একজন শিল্পীর জন্য অনেক বড় ক্ষতির বিষয়। সংস্কৃতি আমাদের প্রধান পরিচয়। সে জায়গা থেকে এভাবে কনসার্ট বাতিল হওয়ার ঘটনা মোটেও ভালো লক্ষণ নয়।

এখানে প্রশাসনের বড় ভূমিকা রয়েছে। তারা কী ভূমিকা পালন করছে এবং ভবিষ্যতে কী করবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। কোনো একটি পক্ষ আপত্তি করল আর তার কারণে প্রশাসন অনুষ্ঠান বাতিল করে দিল-এমনটা তো হতে পারে না। এটি সরাসরি সংস্কৃতির ওপর হুমকি।

ধরলাম কোনো একটি গোষ্ঠী কোনো একটি অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আপত্তি করল। কিন্তু তাঁর আপত্তির যদি কোনো যৌক্তিক কারণ না থাকে, শুধু বললেন তাঁর ওই শিল্পীর গান ভালো লাগে না-তাহলে তাঁর ভালো না লাগার কারণে অন্য যাঁরা সেই শিল্পীর গান পছন্দ করেন, তাঁদের সাংস্কৃতিক অধিকারেও তো আঘাত করা যায় না।

আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির বড় পরিচয়ই তো নাচ, গান, আবৃত্তি, অভিনয়, যাত্রাপালা। অথচ যাত্রাপালা এখন প্রায় দেখাই যায় না। কেন এটিকে আরও যতœ নিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে না, লালন-পালন করা হচ্ছে না-সেটিও বুঝি না। আমি নিজেও ছোটবেলায় যাত্রাপালা দেখেছি। আমাদের নেত্রকোনার বাসার সামনে রেলক্রসিং বাজারে যাত্রাপালা হতো। দিন-রাত সেখান থেকে যাত্রাপালার শব্দ শোনা যেত। সেই সংস্কৃতি এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

কথা হচ্ছে, যে ধর্মেরই হোক, যে মতেরই হোক-কারও বা কোনো গোষ্ঠীর কোনো কিছু ভালো না লাগতেই পারে। কিন্তু দু-একজনের ব্যক্তিগত চিন্তা বা অপছন্দের কারণে একটি দেশের সংস্কৃতি এভাবে হুমকির মুখে পড়তে পারে না। এখানে প্রশাসনেরই বড় ভূমিকা পালন করা উচিত। কোনো বৈধ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি থাকলে তার যৌক্তিকতা যাচাই করতে হবে, প্রয়োজন হলে নিয়মশৃঙ্খলা মেনে সমাধান করতে হবে; কিন্তু অযৌক্তিক আপত্তির কারণে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমাধান নয়।

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়েরও এ বিষয়ে আরও কঠোর ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা উচিত। নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে কেন একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাতিল করতে হবে? আমরা তো কোনো জঙ্গি রাষ্ট্রে বাস করছি না, আমাদের পরিস্থিতি পাকিস্তানের মতোও নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কোনো অনুষ্ঠানে সমস্যা বা হুমকি তৈরি হলে সেটি মোকাবিলা করে শিল্পী ও দর্শকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রশাসনের দায়িত্ব।

সরকারের কাছে আমার চাওয়া একটাই-দেশের শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁরা যেন স্বাধীন ও নিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে পারেন। তাঁদের কাজে যেন কোনো ধরনের অযৌক্তিক বাধা না আসে। শিল্পীদের কর্মপরিবেশ ঠিক রাখা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকা- নির্বিঘেœ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

চমক দেখালো ‘গাঁওঘর’

গাঁওঘর একটি গানের দল। ঢাকা কলেজের ক্যাফেটরিয়ায় ‘গাঁওঘর’ এর জন্ম। গাঁও ঘর-নামটির মধ্যেই গ্রাম, গ্রামীন সংস্কৃতির একটি ছায়া স্পষ্ট। গাঁওঘরের আট রতœ যথাক্রমে ইমন, অপূর্ব, সোহেল খান, মুশফিক, মেহেদি হাসান, অপূর্ব, রাহাত মোল্লা মনে করেন লোক সাহিত্য থেকে শুরু করে পালা গান, পুথি পাঠ, জারি, সারি, ভাটিয়ালী, গম্ভীরা, ভাওয়াইয়া, এমনকি কীর্তন ও গজল সবকিছুই এ ভূখন্ডের ধুলি কনায় মিশে আছে। গাঁওঘরের সদস্যরা আরও মনে করেন শিল্প ও সংস্কৃতি মানুষের অন্তরের খোরাক। মানুষ যেমন প্রাত্যহিক জীবনে আহারে বেঁচে থাকে তেমনই তার অন্তজীবন বেঁচে থাকে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির রসে। 

লেখাপড়ার পাশাপাশি গানের চর্চা করেন গাঁওঘর এর সদস্যরা। গাঁওঘর নিয়ে তাদের অনেক বড় স্বপ্ন। অনেকটা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার মতো- দেখিস আমরাও একদিন... পরিচিতজনদের ডাকে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন গাঁওঘর এর সদস্যরা। সম্প্রতি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে এথিক এর সাড়া জাগানো নাটক ‘হাড়ি ফাটিবে’র শততম মঞ্চায়নের দিনে নাটক শুরুর আগে কয়েকশ দর্শক ও অতিথিদেরকে গান গেয়ে শোনান গাঁওঘর এর সদস্যরা। গাঁওঘর এর গান শুনে সবাই ভূয়শী প্রশংসা করেন। 

আনন্দ আলো পরিবারের পক্ষ থেকে গাঁওঘরকে অভিনন্দন। ও হ্যা দল পরিচিতি আবার উল্লেখ করছি। কন্ঠ: ইমন ও অপূর্ব, উকুলেলে: সোহেল খান, কাহন: মুশফিক, বাঁশি: মেহেদী হাসান, মন্দিরা: অপূর্ব, খমক: রাহাত মোল্লা, গিটার: বাদল।


সুর সঙ্গীত নিয়ে

লোড হচ্ছে...