স্টিল শিল্পকে টিকিয়ে রাখা মানে শিল্পায়নকে শক্তিশালী করা
প্রকাশ:
5
বাংলাদেশের শিল্পায়নের ইতিহাসে স্টিল শিল্পের বিকাশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অবকাঠামো নির্মাণ, আবাসন খাত, সেতু, সড়ক, শিল্পকারখানা কিংবা অর্থনৈতিক অঞ্চল-প্রায় সব উন্নয়ন কর্মকা-ের পেছনেই রয়েছে স্টিল শিল্পের অবদান। এই শিল্পের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং নীতিগত চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনায় যাঁদের নাম গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তাঁদের মধ্যে অন্যতম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। তিনি জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনশীল শিল্পখাতের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের পরিচয় কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দেশের শিল্পনীতি, উৎপাদন খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে সক্রিয়ভাবে মতামত দিয়ে আসছেন। তাঁর বক্তব্যে প্রায়ই উঠে আসে শিল্পায়নকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখার একটি দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি মনে করেন, একটি দেশের অর্থনৈতিক শক্তি নির্ভর করে তার উৎপাদন সক্ষমতার উপর। আর সেই উৎপাদন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী না করে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।
জিপিএইচ ইস্পাতের নেতৃত্বে তিনি বাংলাদেশের স্টিল শিল্পে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন ব্যবস্থা, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দেশের শিল্পখাতে একটি আলাদা অবস্থান তৈরি করেছে। বিশেষ করে বিশ্বমানের প্রযুক্তিনির্ভর স্টিল উৎপাদনের উদ্যোগ দেশের শিল্পখাতে নতুন আস্থার জন্ম দিয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে জিপিএইচ ইস্পাত শুধু উৎপাদন বৃদ্ধির দিকেই মনোযোগ দেয়নি, বরং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও দীর্ঘমেয়াদি শিল্প সক্ষমতা তৈরির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছে।
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম প্রায়ই বলেন, শিল্পের বিকাশকে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মুনাফার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত নয়। শিল্পের সঙ্গে কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং জাতীয় অর্থনীতির বহুমাত্রিক সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর মতে, শিল্পের প্রতিটি নতুন বিনিয়োগ দেশের জন্য নতুন কর্মসংস্থান, নতুন কর রাজস্ব এবং নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করে।
স্টিল শিল্পের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি প্রায়ই দেশের বাজার বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশে স্টিল উৎপাদনের সক্ষমতা বর্তমানে অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু অর্থনৈতিক কর্মকা-ের গতি কমে যাওয়ায় এবং উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ধীরগতির হওয়ায় শিল্পের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে অনেক কারখানাই তাদের স্থাপিত সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করছে।
তিনি মনে করেন, এই পরিস্থিতিতে শিল্পের উপর অতিরিক্ত কর বা ব্যয় চাপিয়ে দিলে উৎপাদন খাত আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। তাঁর ভাষায়, “রাজস্ব বৃদ্ধির সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো উৎপাদন বৃদ্ধি, শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন কর্মকা-ের গতি ত্বরান্বিত করা।” এই বক্তব্যে তাঁর অর্থনৈতিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়। তিনি বিশ্বাস করেন, শিল্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব, কিন্তু অতিরিক্ত কর আরোপের মাধ্যমে শিল্পের গতি কমিয়ে দিলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবহন এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খাতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, সে বিষয়েও তিনি সরব। তাঁর মতে, শিল্প উদ্যোক্তারা বর্তমানে একাধিক দিক থেকে ব্যয় বৃদ্ধির মুখোমুখি। বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি, বন্দরের বিভিন্ন চার্জ, পরিবহন ব্যয় এবং উৎপাদন উপকরণের খরচ বৃদ্ধির ফলে শিল্প পরিচালনা আগের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
একাধিক অনুষ্ঠানে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিল্পায়ন একে অপরের পরিপূরক। সড়ক, সেতু, রেলপথ, বন্দর, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পাঞ্চল কিংবা আবাসন প্রকল্প-সব ক্ষেত্রেই স্টিল অপরিহার্য উপাদান। ফলে উন্নয়ন কর্মকা- যত বাড়বে, স্টিল শিল্পের চাহিদাও তত বৃদ্ধি পাবে। আর স্টিল শিল্পের সম্প্রসারণ হলে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে সিমেন্ট, কাচ, সিরামিক, প্রকৌশল, পরিবহন এবং নির্মাণসামগ্রী খাতেও।
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের বক্তব্যে উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। তিনি মনে করেন, বাজেটে বড় বরাদ্দ ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়; প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে হবে। কারণ প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হলে বাজারে চাহিদা তৈরি হয়, শিল্পকারখানার উৎপাদন বাড়ে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং অর্থনৈতিক কর্মকা- গতিশীল হয়। তাঁর মতে, উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি নিশ্চিত করা গেলে দেশের উৎপাদনশীল শিল্পগুলো নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবে।
দেশীয় শিল্প সুরক্ষার প্রশ্নেও তাঁর অবস্থান সুস্পষ্ট। তিনি মনে করেন, স্থানীয় শিল্পকে শক্তিশালী না করে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়। বিশেষ করে স্টিল শিল্পের মতো মূলধনী শিল্প খাতকে টিকিয়ে রাখা জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ এই শিল্প শুধু পণ্য উৎপাদন করে না; এটি বৃহৎ পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, সহায়ক শিল্পের বিকাশ ঘটায় এবং সরকারের জন্য উল্লেখযোগ্য রাজস্বও নিশ্চিত করে।
তাঁর বক্তব্যে প্রায়ই একটি বিষয় উঠে আসে-বাংলাদেশের শিল্পখাতকে শুধু বর্তমান সংকট নয়, ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দিক থেকেও দেখতে হবে। তিনি বিশ্বাস করেন, দেশের অর্থনীতি, জনসংখ্যা এবং নগরায়ণের যে প্রবণতা রয়েছে, তাতে আগামী বছরগুলোতে অবকাঠামো ও নির্মাণ খাতে স্টিলের চাহিদা আরও বাড়বে। সেই চাহিদা পূরণের জন্য স্থানীয় শিল্পকে এখন থেকেই সক্ষম করে তুলতে হবে।
একজন শিল্পনেতা হিসেবে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের ভূমিকার বিশেষত্ব হলো, তিনি শুধু নিজের প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ নয়, পুরো শিল্পখাতের সামগ্রিক বাস্তবতা নিয়ে কথা বলেন। উৎপাদন ব্যয়, করনীতি, জ্বালানি মূল্য, বিনিয়োগ পরিবেশ, উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন কিংবা শিল্পায়নের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা-সব ক্ষেত্রেই তিনি একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন।
বাংলাদেশের শিল্প খাত বর্তমানে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অভ্যন্তরীণ বাজারের সীমাবদ্ধতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের ধীরগতি শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের বক্তব্য এবং অবস্থান দেশের উৎপাদনমুখী শিল্পের উদ্বেগ ও প্রত্যাশার প্রতিফলন হিসেবেই বিবেচিত হয়।
জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে তিনি এমন একটি অবস্থানে রয়েছেন, যেখানে শিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনা দুটিকেই খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ তাঁর রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বারবার উৎপাদন বৃদ্ধি, শিল্পবান্ধব নীতি, উন্নয়ন প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্প পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর বিশ্বাস, শক্তিশালী শিল্পভিত্তি ছাড়া কোনো দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। আর সেই কারণেই বাংলাদেশের শিল্পায়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী নাম।
দেশের শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি বিভিন্ন সময়ে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, শিল্প উদ্যোক্তারা সাধারণত পাঁচ বা দশ বছরের পরিকল্পনা মাথায় রেখে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু করনীতি, শুল্ক কাঠামো কিংবা জ্বালানি ব্যয়ে হঠাৎ বড় ধরনের পরিবর্তন এলে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে হলে শিল্প-সংশ্লিষ্ট নীতিমালায় পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি।
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম প্রায়ই উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের শিল্পায়নের পরবর্তী ধাপ হবে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং দক্ষতা বৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ালেই হবে না, উৎপাদনের মান ও দক্ষতাও বাড়াতে হবে। তাঁর মতে, আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।
তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত জিপিএইচ ইস্পাতের অভিজ্ঞতাও এই দর্শনের প্রতিফলন। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ ব্যয় নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি কৌশলগত বিনিয়োগ। কারণ প্রযুক্তি উৎপাদন ব্যয় কমায়, মান উন্নত করে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা তৈরি করে। এই কারণে তিনি শিল্পখাতে আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণে সরকারি প্রণোদনা ও নীতিগত সহায়তার পক্ষেও কথা বলে থাকেন।
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তিনি মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন-উৎপাদন বৃদ্ধি, শিল্পের সক্ষমতা রক্ষা এবং উন্নয়ন কর্মকা-ের গতি ত্বরান্বিত করা। তাঁর বিশ্বাস, এই তিনটি লক্ষ্য অর্জন করা গেলে শুধু স্টিল শিল্প নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিও নতুন গতি পাবে। কর্মসংস্থান বাড়বে, বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও টেকসইভাবে সম্প্রসারিত হবে।
বাংলাদেশ দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এই যাত্রায় অবকাঠামো ও শিল্পায়ন হবে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। আর সেই শিল্পায়নের ভিত্তি নির্মাণে যে কয়েকজন শিল্পনেতা ধারাবাহিকভাবে নীতিগত আলোচনা, শিল্পের স্বার্থ রক্ষা এবং উৎপাদনমুখী অর্থনীতির পক্ষে ভূমিকা রেখে চলেছেন, মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম তাঁদের অন্যতম। তাঁর বক্তব্যে যেমন বর্তমান বাস্তবতার প্রতিফলন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ভবিষ্যতের বাংলাদেশের শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির একটি সুস্পষ্ট রূপরেখাও।