পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য নিয়ে কাজ করতে চান স্থপতি ঋতুপর্ণা
প্রকাশ:
4
আধুনিক স্থাপত্যশিল্পে পরিবেশবান্ধব ,মানববান্ধব ও নান্দনিক স্থাপনা করে যাচ্ছেন স্থপতি ঋতুপর্ণা দে। তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য ডিসিপ্লিনে পড়াশোনা করেছেন। তাঁর রয়েছে “নৃ-ছায়া” নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের তিনি প্রিন্সিপাল আর্কিটেক্ট এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর। চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন বিশিষ্ট স্থপতি কাজী নূরুল করিম দিলু। ইতোমধ্যে এই প্রতিষ্ঠানটি বেশ কিছু দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার নকশা করেছে। এবার শাহ্ সিমেন্ট নির্মাণে আমিতে এই স্বনামধন্য স্থপতিকে নিয়ে প্রতিবেদন। লিখেছেন-মোহাম্মদ তারেক
ক্লায়েন্টের স্বপ্ন ও চাহিদাকে স্থাপত্যিক নীতিমালা এবং প্রকৌশলগত চর্চার সমন্বয়ে বাস্তব রূপ দিয়ে সবুজ নগর পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ নগরায়ণের ভাবনায় সক্রিয়ভাবে অবদান রাখাই আমাদের প্রচেষ্টা। কথা গুলো বললেন স্থপতি ঋতুপর্ণা দে। তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা খুলনায়। ঋতুপর্ণার বাবা প্রয়াত রঞ্জন কুমার একজন ব্যাংকার ছিলেন। মা জয়া দে গৃহিণী। পরিবারের একমাত্র সন্তান ঋতুপর্ণা। তাঁর জীবনে বাবা-মায়ের অবদান অপরিসীম। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই ঋতুপর্ণা সংস্কৃতির বিভিন্ন কর্মকা-ের সাথে জড়িত ছিলেন। আঁকাআঁকি করতেন। গান ছিল তার পছন্দের বিষয়। রবীন্দ্র সংগীত ভালো গাইতেন। সেই ছোটবেলা থেকেই গানের চর্চা করে যাচ্ছেন তিনি। কাজের ফাঁকে এখনো গেয়ে যাচ্ছেন গান। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী। গান আর সৃজনশীল কাজ দুটিই করে যাচ্ছেন সমানতালে।সরাকারি করোনেশন বালিকা বিদ্যালয় থেকে তিনি এসএসসি পাস করেন ২০০১ সালে। ২০০৩ সালে খুলনা মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে ভর্তি হন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য ডিসিপ্লিনে। ২০১০ সালে তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য ডিসিপ্লিনে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। পাশ করার আগে থেকেই তিনি স্বনামধন্য স্থপতি নাজিম উদ্দিন পায়েলের অধীনে স্থাপত্যচর্চা শুরু করেন। সেখানে দুই বছর কাজ করেন। প্রতিনিয়ত তিনি স্বপ্ন দেখতেন, প্রথিতযশা স্থপতিদের সঙ্গে স্থাপত্যচর্চা করবেন, নিজের যোগ্যতা মেলে ধরবেন। অবশেষে এই স্থপতির স্বপ্ন বাস্তবায়ন হলো। খুলনা থেকে তিনি চলে এলেন ঢাকায়। তারপর থেকেই শুরু হলো তাঁর কাজের ব্যস্ততা।
পেশাগত জীবনের শুরুতেই তিনি কাজ করার সুযোগ পান আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্থপতি রফিক আজমের প্রতিষ্ঠিত ‘সাতত্য’ ফার্মে। সেখানে তিনি চার বছর কাজ করেন। ২০১৫ সালে তিনি যোগ দেন শান্তা ডেভেলপার কোম্পানিতে
পরবর্তীতে ২০১৯ সালে তিনি প্রখ্যাত স্থপতি ফয়েজ উল্লাহ স্যারের ‘স্পেস জিরো’ প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করার মাধ্যমে পেশাগত অভিজ্ঞতার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেন। ২০২২ সাল থেকে “নৃ-ছায়া” এর প্রিন্সিপাল আর্কিটেক্ট ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন আধুনিক, পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যচর্চা নিয়ে।
এই স্থপতির উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে- ঢাকা আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ভবন অংশ,গাজীপুরে উৎসব রিসোর্ট,খুলনা বাগেরহাটে মোশাররফ হোসেন কলেজ কমপ্লেক্স, কালিগঞ্জে জামে মসজিদ, পূর্বাচলে ওয়াদুদ রেসিডেন্স বিল্ডিং, কালিগঞ্জের মন্দির অ্যাসোসিয়েশনের অফিস বিল্ডিং, গাজীপুরে আট তলা অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং, কক্সবাজারে হানি ক্যাফে, ইনানী বিচে বিচ রিসোর্ট, জলসিঁড়ি আবাসনে এসইএল ডেভেলপারের রেসিডেন্স বিল্ডিং, ধানমন্ডি ৫/এ এর পার্ক প্যানারোমা ভবনের রেনোভেশন, খুলনায় বিমল বাবুর ডুপ্লেক্স বাড়ি সহ অসংখ্য স্থাপনার নকশা ও ইন্টেরিয়র করেছেন। এছাড়াও বেশ কয়েকটি নতুন প্রজেক্টের কাজ করছেন তিনি।
স্থপতি ঋতুপর্ণা দে বলেন, ক্লায়েন্টের চাহিদা ও স্বপ্নকে দেশের জলবায়ু এবং স্থানীয় প্রেক্ষাপটর বিবেচনায় নিয়ে, স্থাপত্যের নান্দনিক ভাষা ও প্রকৌশলগত মানদ-ের সমন্বয়কে বাস্তব রূপ দেওয়াই আমাদের মূল দৃষ্টিভঙ্গি। এক্সটেরিয়র ও ইন্টেরিয়র উভয় ক্ষেত্রেই পরিবেশ ও প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপটকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়, পাশাপাশি প্রতিটি প্রকল্পকে একটি সুসংগঠিত স্থাপত্যিক অভিজ্ঞতা হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়।
প্রতিটি স্পেসকে আমরা শুধুমাত্র কার্যকরনয়, বরং একটি নান্দনিক ও অনুভূতিনির্ভর অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করি। আলো, ছায়ার সুচিন্তিত ব্যবহার লিভিং এক্সপেরিয়েন্সকে আরও সমৃদ্ধ ও অর্থবহ করে তোলে। ম্যাটেরিয়াল নির্বাচনের ক্ষেত্রে জলবায়ু-উপযোগিতা দেশীয় প্রেক্ষাপট এবং স্থায়িত্বের বিষয় গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। আমাদের নকশার মূল উদ্দেশ্য এমন স্থাপত্যতৈরি করা, যা প্রকৃতির মাঝে জড় বস্তু দিয়ে নির্মিত স্থাপনায় প্রাণ নিয়ে আসে, সমসাময়িক চর্চাকে সমৃদ্ধ করে এবং দেশের টেকসই স্থাপত্য উন্নয়নের পথে ইতিবাচক অবদান রাখে।
‘উৎসব’ রিসোর্ট প্রজেক্টটি সম্পর্কে স্থপতি ঋতুপর্ণা দে বলেন, ঢাকা শহরের ব্যস্ত নগরজীবনের কোলাহল থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে, প্রাকৃতিক শান্তি ও নির্মল পরিবেশের মাঝে এই প্রকল্পটি পরিকল্পিত হতে চলেছে একটি নিরিবিলি অবকাশযাপনের গন্তব্য হিসেবে। প্রায় ১২.৫ বিঘা খোলা জমির ওপর গড়ে ওঠা এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল এমন একটি রিসোর্ট তৈরি করা, যেখানে মানুষ নগরজীব নের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে এসে বিশ্রাম, নীরবতা এবং সবুজ প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটাতে পারে। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো আনন্দঘন মুহূর্ত, একাত্মতা এবং স্মরণীয় অভিজ্ঞতার প্রতিফলন হিসেবে রিসোর্টটির নাম রাখা হয়েছে ‘উৎসব’।
রিসোর্টটিতে অতিথিদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থার পাশাপাশি কটেজ, বিনোদনকেন্দ্র, শিশুদের খেলার মাঠ, সুইমিং পুল এবং একটি বহুতল হোটেল ভবন পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। অতিথিদের সার্বিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ভবনটি তে রেস্তোরাঁ, জিমনেশিয়াম এবং বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক সেবার পাশাপাশি একটি ছাদভিত্তিক ফুড কোর্ট সংযোজন করা হয়েছে।
সামগ্রিক পরিকল্পনায় পথ ও চলাচলব্যবস্থাকে এমনভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে, যাতে প্রতিটি যাত্রাপথদর্শনার্থীদের ধীরে ধীরে প্রকৃতির আরও কাছাকাছিনিয়ে যায়। পরিকল্পিতজলাধারকে ঘিরে রিসোর্টটির নকশা-ভাবনার বিকাশ ঘটেছে। জলাধারপাড়ের অবকাশযাপনের জন্য নির্মিত সিমপ্লেক্স ও ডুপ্লেক্স কটেজগুলো এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে দর্শনার্থীরা প্রকৃতির শান্ত সান্নিধ্যে বসে গ্রামীণ জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত সৌন্দর্য অনুভব করতে পারবেন। একই সঙ্গে সাইটের বিদ্যমান গাছপালা সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সমগ্র পরিকল্পনাটি বিন্যস্ত করা হয়েছে, যাতে স্থাপত্যও প্রকৃতির মধ্যে একটি সুষম সহাবস্থান নিশ্চিত হয়।
জলাশয়ের ধারে নীরব ও প্রশান্ত মুহূর্ত উপভোগের জন্য একটি ঘাট রয়েছে। জলাশয়ের কিনারা ধরে নকশাকৃত পদচারণ পথটি দর্শনার্থীদের নিয়ে যায় একটি বিস্তৃত উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে। এই প্রাঙ্গণের এক পাশে রয়েছে রেস্তোরাঁ এবং অপর পাশে সুইমিং পুল ও খেলার মাঠ, যাঅবকাশ, বিনোদন ও সামাজিক মেলবন্ধনের জন্য একটি প্রাণবন্ত পরিসর তৈরি করেছে। প্রকল্পটির চারপাশজুড়ে রয়েছে বাংলাদেশের বন বিভাগের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল এবং প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা খাল, যা রিসোর্টটিকে প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে একাত্ম করার মূল নকশা-ভাবনার উৎস হিসেবে কাজ করেছে। প্রকল্পের প্রবেশমুখে অবস্থিত দর্শনীয় রেস্তোরাঁটিতে এমন একটি ভিস্তাসৃষ্টি করা হয়েছে, যা পুরো রিসোর্ট এলাকা এবং পার্শ্ববর্তী বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের একটি প্রাথমিক ধারণা দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরে।
প্রকল্পটিতে দেশীয় নির্মাণ কৌশলের সঙ্গে সমসাময়িক নির্মাণ উপকরণের সুষম সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। ইট, আরসিসি ছাদ এবং কাঠের টেক্সচারযুক্ত বিভিন্ন উপকরণের বহুমাত্রিক ব্যবহার এমনভাবে পরিকল্পিত হয়েছে, যা স্থাপনাগুলোকে দৃঢ়তা ও স্থায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে একাত্ম হতে সহায়তা করেছে। কাচের সুচিন্তিত ব্যবহার প্রাকৃতিক আলোকে স্থাপনার অংশ করে তুলেছে এবং অভ্যন্তরীণ পরিসর ও প্রকৃতির মধ্যে একটি নিবিড় সংযোগ সৃষ্টি করেছে।
এই নকশার মূল উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা যেখানে মানুষ প্রশান্তি ও স্বস্তি খুঁজে পাবে এবং প্রকৃতির সঙ্গে সুর মিলিয়ে সময় কাটাতে পারবে। ‘উৎসব রিসোর্ট’ কেবল একটি অবকাশযাপনের স্থান নয়, বরং প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝে মানুষের আনন্দময় মুহূর্ত, আন্তরিক সংযোগ এবং স্মরণীয় অভিজ্ঞতার এক অনন্য ঠিকানা।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে স্থপতি ঋতুপর্ণা বলেন, পরিবেশ ও দেশীয় প্রেক্ষাপটকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে স্থাপত্যচর্চাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই আমাদের লক্ষ্য বিশেষ করে জনঘনত্বপূর্ণ ঢাকার ভবিষ্যৎ ভবন নকশায় প্রকৃতিকে আরও নিবিড়ভাবে অন্তর্ভুক্তকরা। বহুতল ভবনে ভার্টিকাল সবুজায়ন ও প্রকৃতিনির্ভর নকশার মাধ্যমে উচ্চ ভবনেও যেন মানুষ প্রাকৃতিক পরিবেশের সান্নিধ্য অনুভব করতে পারে, সেই প্রচেষ্টাই অব্যাহত থাকবে আমাদের সবসময়।