
স্থাপত্য চর্চায় ভারসাম্য অন্বেষণে তিন সহযাত্রী

জলবায়ু, সংস্কৃতি, ভূ প্রকৃতি ও মানুষের মমত্ববোধ নিয়ে স্থাপত্য শিল্পে সৃষ্টিশীল কাজ করে যাচ্ছেন স্থপতি মোঃ নাহিদ হাসান, স্থপতি এস. এম. রুহুল আমিন ও স্থপতি অনিমেষ প্রভাকর দেবনাথ। তাঁরা তিনজন ভালো বন্ধু। তিনজনেই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এর স্থাপত্য ডিসিপ্লিনে পড়াশোনা করেছেন। তাদের রয়েছে “ গ্র্যাভিটি আর্কিটেকচার স্টুডিও’’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ইতোমধ্যে এই প্রতিষ্ঠানটি বেশ কিছু দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার নকশা তৈরি করেছে। এবার শাহ্ সিমেন্ট নির্মাণে আমিতে এই স্থপতিত্রয়ীকে নিয়ে প্রতিবেদন। লিখেছেন – মোহাম্মদ তারেক
স্থাপত্য কেবলই ভবন নির্মাণের অনুশীলন নয়- বরং এটি আবহমান সময়, ভূমি-প্রাকৃতিক প্রেক্ষাপট এবং মানুষের সমন্বয়ে রচিত একটি দীর্ঘ সংলাপ। এই সংলাপেই বিশ্বাস রেখে “গ্র্যাভিটি আর্কিটেকচার স্টুডিও”-র যাত্রা শুরু হয় তিন সহযাত্রী স্থপতি নাহিদ হাসান, স্থপতি রুহুল আমিন ও স্থপতি অনিমেষ প্রভাকরের হাত ধরে।
২০১০-২০১১ সালে তিনজনেই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ডিসিপ্লিন এ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ প্রাকৃতিক প্রেক্ষাপট নির্ভর ও গবেষণাভিত্তিক পাঠক্রম তাঁদেরকে শিখিয়েছে-স্থাপত্য কখনোই সমাজ-বিচ্ছিন্ন কোনো অবজেক্ট নয়; এটি ভূমি, জলবায়ু, সংস্কৃতি ও ব্যবহারের সমন্বিত ফল। এই একাডেমিক ভিত্তিই পরবর্তী পেশাগত জীবনে তাদের কাজের ভাষা ও অবস্থানকে সুসংহত করেছে।

“গ্র্যাভিটি আর্কিটেকচার স্টুডিও’’ : প্রেক্ষিত, নিয়ম ও বাস্তবতার সংযোগ- এই স্থপতিরা জানান, ২০১৬ সালে তিন বন্ধুর হাত ধরে “ গ্র্যাভিটি আর্কিটেকচার স্টুডিও “ প্রতিষ্ঠিত হয় একটি স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান নিয়ে। স্থাপত্য হবে পরিপ্রেক্ষিত নির্ভর, নিয়মমাফিক এবং কালপরিক্রমায় টেকসই। স্টুডিও-র কাজের দর্শনে নিয়ম ও নীতিমালা কোনো সীমাবদ্ধতা নয়; বরং সেগুলোকে একটি সুস্থ কাঠামো হিসেবে দেখা হয়, যার ভেতরে থেকেই সৃজনশীলতার বিকাশ সম্ভব। বিএনবিসি, ফায়ার কোড, নগর উন্নয়ন বিধি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা-এসবকে নকশা প্রক্রিয়ার প্রাথমিক স্তর থেকেই অন্তর্ভুক্ত করে কাজ করা।

এই পদ্ধতির মধ্য দিয়ে ‘গ্র্যাভিটি আর্কিটেকচার স্টুডিও’ একটি ভারসাম্যপূর্ণ স্থাপত্যচর্চার দিকে অগ্রসর হয়েছে যেখানে নান্দনিকতা, ব্যবহারিক সুবিধা ও আইনগত স্বচ্ছতা একসাথে বিবেচিত হয়।
স্টুডিওটির কাজের পরিসর আবাসিক ভবন থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক, প্রাতিষ্ঠানিক, পাবলিক পরিসর, ক্রীড়া স্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প, মাস্টারপ্ল্যান এবং ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইন পর্যন্ত বিস্তৃত। এই প্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে-জলসিঁড়ি, সেক্টর- ১৭-তে ‘জলসিঁড়ি গলফ ক্লাব’, ঢাকা সেনানিবাসে, মাটিকাটায় ‘সেনাপ্রাঙ্গণ ‘(আর্মি অডিটোরিয়াম কমপ্লেক্স ), চট্টগ্রাম ভাটিয়ারীতে ‘বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল’, ‘চট্টগ্রাম ভাটিয়ারীতে’, ‘বিএমএ কেন্দ্রীয় মসজিদ’, ঢাকায় ‘ফ্রিডম টাওয়ার ’, কুয়াকাটায় ‘হোটেল পার্ক’, জুলিয়েট’, জাজিরা সেনানিবাসে ৫০ মিটার ‘সুইমিং পুল’ (অলিম্পিক মানসম্মত), যশোরে ‘পাটোয়ারী টাওয়ার’, জাজিরা সেনানিবাসে ‘জাজিরা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ’, বসুন্ধরায় আবাসিক এলাকায় ‘ আরণ্যক ‘(বহুতল আবাসিক ভবন ), বরিশালে ‘কাশফুল টাওয়ার’ সহ অসংখ্য ভবনের নকশা করেছে এই প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিটি প্রকল্পেই তাঁরা গুরুত্ব দিয়েছেন পরিকল্পনার স্বচ্ছতা, চলাচলের যুক্তি, কাঠামোগত নিরাপত্তা এবং ভবনের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার যোগ্যতার উপর যা তাদের কাজকে একটি নির্ভরযোগ্য পেশাগত অবস্থানে স্থাপন করেছে।

স্থাপত্যচর্চার বাস্তবতা ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি : বাংলাদেশের দ্রুত পরিবর্তনশীল নগর প্রেক্ষাপটে স্থাপত্যচর্চা প্রতিনিয়ত নতুন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার মুখোমুখি হচ্ছে। ‘গ্র্যাভিটি আর্কিটেকচার স্টুডিও’ এই বাস্তবতাকে একটি শেখার ও উন্নতির সুযোগ হিসেবে দেখে। তাদের বিশ্বাস, স্থাপত্যচর্চার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন- সময় নিয়ে ভাবা, নিয়ম বোঝা এবং ব্যবহারকারীর বাস্তব প্রয়োজনকে সম্মান করা। এই ইতিবাচক মনোভাব থেকেই তাঁরা প্রতিটি প্রকল্পে সমন্বয়, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান এবং ধাপে ধাপে পরিশীলিত নকশার দিকে এগিয়ে যান।
তরুণ স্থপতিদের উদ্দেশ্য এই স্থপতিরা বলেন, নতুন স্থপতিদের জন্য আমাদের বার্তা সংক্ষিপ্ত কিন্তু স্পষ্ট- ভালো স্থাপত্য সময় নিয়ে তৈরি হয়। ড্রইং ও সফটওয়্যার দক্ষতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন আইন জানা, সাইট বোঝা এবং ব্যবহারকারীর সাথে সংলাপ তৈরি করা। নিয়ম জানা ও মানা একজন স্থপতিকে আরও আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্বশীল করে তোলে এই বিশ্বাসেই আমরা নতুনদের এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেই।
আগামীর পথচলা : “গ্র্যাভিটি আর্কিটেকচার স্টুডিও’’ এর ভবিষ্যৎ পথচলা নির্ধারিত হচ্ছে কাজের মান ও অবস্থানের স্পষ্টতায়। আমাদের কাছে স্থাপত্যের অগ্রগতি মানে আরও বেশি নির্মাণ নয়; বরং যে প্রেক্ষিতে কাজ করা হচ্ছে, সেই প্রেক্ষিতের প্রতি আরও সংবেদনশীল হওয়া। আইন ও নীতিমালাকে আমরা ভবিষ্যৎ কাজের ভিত্তি হিসেবেই দেখতে চাই। শুধু অনুসরণের জন্য নয়, বরং নকশার ভাষাকে আরও পরিশীলিত করার জন্য। একই সঙ্গে জলবায়ু, ভূপ্রকৃতি ও স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সম্মান রেখে এমন নকশার দিকে আমরা অগ্রসর হতে চাই , যা সময়ের সাথে মানিয়ে নিতে পারে এবং ব্যবহারকারীর জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
“গ্র্যাভিটি আর্কিটেকচার স্টুডিও’’ বিশ্বাস করে, স্থাপত্য তখনই অর্থবহ হয় যখন তা পরিবেশের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি না করে, বরং ধীরে, দায়িত্বশীলভাবে এবং সচেতন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। ভবিষ্যতে আমরা এই ধারাবাহিকতাতেই কাজ করতে চাই।আমাদের কাছে স্থাপত্য কোনো গন্তব্য নয়, বরং দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এগিয়ে চলার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...



