Ad space

আমাদের ঈদ উৎসব

প্রকাশ:
55
Image

আমাদের দেশে ঈদ উৎসবই বড় উৎসব। আড়াই মাসের ব্যবধানে দুটি ঈদ। ঈদুল ফিতর। ঈদুল আজহা। রমজানের একমাস সিয়াম সাধনার পর, অর্থাৎ একমাস রোজা রাখার পর আমরা ঈদুল ফিতর পালন করি। এর আড়াইমাস পর আসে ঈদুল আজহা অর্থাৎ কুরবানীর ঈদ।

দুটি ঈদে দুই ধরনের প্রস্তুতি থাকে। ঈদুল ফিতর অর্থাৎ পবিত্র রমজানের ঈদের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনি আমরা। কবে আসবে ঈদুল ফিতর। নতুন কাপড় চাই। পাশাপাশি সংসারকে নতুন করে সাজাই আমরা। ধনী, গরীব যার যতটুকু সামর্থ্য আছে সেই সামর্থ্যরে ভেলায় চড়ে ঈদের দিনের জন্য অপেক্ষায় থাকি। ঈদুল ফিতরে নতুন কাপড়ের পাশাপাশি গেরস্থলির বিভিন্ন জিনিস কেনাকাটায় ব্যস্ত হই আমরা। দেশে-বিদেশে বেড়াতে যাবার পরিকল্পনা করি।

ঈদুল আজহা অর্থাৎ কুরবানীর ঈদে নতুন কাপড় কেনার তাড়না থাকে না। তবে শুরু হয় ধর্মীয় বিধান মেনে পশু কুরবানী দেওয়ার প্রস্তুতি। আর তাই পশুর হাট হয়ে ওঠে খুবই গুরুত্বপুর্ন। ৩ ভাগ, ৫ ভাগ, অনুর্ধ্ব ৭ ভাগে পশু কুরবানী দেয়ার ধর্মীয় বিধান রয়েছে। সামর্থ্য অনুযায়ী একাই একাধিক পশু কুরবানী দেয়া যায়। সামর্থ্যবানরা তাই করেও। তবে আমাদের দেশে ভাগে কুরবানী দেয়ার প্রবণতাই বেশী। ঈদুল ফিতরে যেমন আমরা নতুন পোশাক, গহনা, গেরস্থালির প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটায় ব্যস্থ থাকি তেমনই ঈদুল আজহায় ব্যস্ত থাকি পশুর হাটে কুরবানীর পশু কেনার জন্য। ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী পশু কুরবানী দিয়ে আমরা নিজেদের অহংবোধ, অহমিকা, পশুত্বকে কুরবানী দেই।

ঈদ উৎসবই আমাদের দেশে বড় ধর্মীয় উৎসব। এজন্য মূলত: সারা বছরের প্রস্তুতি থাকে। বিশেষ করে ঈদুল ফিতরের জন্য প্রস্তুতি শুরু হয় অনেক আগে থেকেই। প্রস্তুতি যেমন শুরু হয় পরিবারে, তেমনই সামাজিক ভাবেও...। ব্যবসায়িদের প্রস্তুতিটা অন্যরকম। ঈদুল ফিতরে নতুন পোশাকের প্রতিই মানুষের ঝোক থাকে বেশী। তাই পোশাক ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশী ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। তবে ব্যস্ততা বেড়ে যায় প্রতিটি পরিবারে গৃহিনীদের মধ্যে। ঈদে মেহমান আসবে। রান্নাঘরের আয়োজনটা ভালো হওয়া চাই। ঈদুল ফিতরে সেমাই অপরিহার্য খাবার। আর ঈদুল আজহায় কুরবানীর মাংস। পশু কুরবানীর জন্য অপেক্ষা। কুরবানীর পর কিছু মাংস চলে যায় রসুই ঘরে। শুরু হয় রসুইঘরের ব্যস্ততা।

তবে হ্যা, প্রতি ঈদে টেলিভিশনের অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে আনন্দ-বিনোদনের প্রধান অনুষঙ্গ। টেবিলে যখন খাওয়ার পর্ব চলে তখনও খোলা থাকে টেলিভিশন সেট। খেতে খেতে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের নাটক, বাহারি অনুষ্ঠান দেখার মধ্যে অন্যরকমের আনন্দ ফুটে ওঠে। টেলিভিশন অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বেড়ানো ঈদ উৎসবের আরেকটি আনন্দের উপলক্ষ। কেউ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেড়াতে যান। কেউবা যান বিদেশে। সঙ্গে থাকে গানের সুর। প্রতি ঈদে সিনেমার পাশাপাশি গানও হয়ে ওঠে ব্যাাপক আগ্রহের বিষয়। এক সময় ঈদ কার্ড ছিল ঈদের শুভেচ্ছা জানানোর জনপ্রিয় মাধ্যম। কালের বিবর্তনে এখন ঈদ কার্ড বিনিময়ের সেই ঐতিহ্য এখন আর দেখা যায় না। মোবাইল ফোনে এসএমএস সেই জায়গাটা দখল করে নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঈদ উপহার হিসেবে ভালো বইয়ের কদর বেড়েছে। এটা শুভ লক্ষণ।

Image

প্রতি ঈদে আনন্দের পাশাপাশি একটা আক্ষেপ থেকেই যায়। সেটা হলো দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি। অথচ উন্নত দেশ সমূহে উৎসব পার্বনে সকল ক্ষেত্রে মূল্য কমিয়ে দেয়া হয়। এটাকে বলা হয় উৎসব উপহার। আর আমাদের দেশে প্রতিটি উৎসব পার্বনে প্রতিটি ক্ষেত্রে দাম বাড়ানোর দুর্বার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। পরিবহনের ভাড়া বাড়ে। চাল, তেল, লবণ সহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের দাম প্রকাশ্যে বাড়িয়ে দেয়া হয়। এনিয়ে আলোচনা হয়, সমালোচনা হয়। কিন্তু কে শোনে কার কথা? চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী। পরিবহন ভাড়া বাড়ে, চাঁদাবাজি বাড়ে। ঈদ উপলক্ষে যে যে ভাবে পারে সাধারণ জনগনকে ভোগান্তির চরম সীমায় নিয়ে যায়। তবুও ঈদ উৎসবের জন্যই আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকি। কারণ একমাত্র ঈদ উৎসবেই সকল ভেদাভেদ ভুলে আমরা একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করি। বুকে বুক মিলাই। ঈদ উৎসবের এটাই বড় সার্থকতা। কুরবানীর ঈদ আমাদের ত্যাগ, তিতীক্ষা ও সংযমের বার্তা দেয়। ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী সামর্থ্যবানরাই পশু কুরবানী দেয়। কিন্তু কুরবানীর মাংসের এক ভাগ গরীব, মিসকিনদের প্রাপ্য। ধর্মীয় এই নির্দেশনা কে কতটুকু মানি এই নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। তবে কুরবানীর ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধান মেনে চলা উচিৎ। প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে ধর্মীয় কোনো উৎসব পালন করার মধ্যে কোনো সার্থকতা নাই। বিশেষ করে কুরবানীর ঈদে সামর্থ্যবানদের উচিৎ অসহায়, দরিদ্র পরিবারের প্রতি খেয়াল রাখা। তাদের মধ্যে কুরবানীর মাংস বিতরণ করার ক্ষেত্রে বিশেষ নজর থাকা জরুরি। পশু কুরবানী আসলে উৎসবের কোনো বিষয় নয়। নিজের অহংবোধ, অহংকার, পশুত্বকে বিসর্জন দেয়ার জন্যই পশু কুরবানী দেয়ার ধর্মীয় বিধান রয়েছে। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় শুধুমাত্র পশুর মাংস খাবার জন্যই কেউ কেউ লোক দেখানো কুরবানী করে। অসহায়দের মধ্যে কুরবানীর মাংস বিলিয়ে দেয় না। তারা বড় অন্যায় করে।

আর তাই আমরা মনে করি এবারের ঈদ উৎসব হোক প্রত্যেকে আমরা পরের তরে এই মানবিক ধারনার প্রতিচ্ছবি। ঈদের প্রকৃত আনন্দ ছড়িয়ে পড়–ক সারাদেশে, ধনী গরীব প্রত্যেকের ঘরে। শেষে একটি অনুরোধ করি। ঈদে টেলিভিশনের অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে আনন্দ-বিনোদনের অন্যতম অনুষঙ্গ। আমাদের দেশে এখন ৩৪টিরও বেশী টেলিভিশন চ্যানেল। প্রতিটি টেলিভিশন চ্যানেল ঈদের বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সাজিয়েছে। সব টেলিভিশন চ্যানেল মিলিয়ে শত শত নাটক সিনেমা প্রচার হবে। কাজেই আমরা ঈদ উৎসবে যেন দেশের টেলিভিশনের অনুষ্ঠানই দেখি। এবারের ঈদ হোক আরও বেশি আনন্দের। ঈদ উৎসবের বর্নিল রঙে আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবন উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক এই শুভ কামনা থাকলো।

প্রিয় পাঠক, ঈদের শুভেচ্ছা নিন। ঈদ মুবাারক।

Image

এক ঈদে ৩শ নাটক টেলিফিল্ম!

প্রতি বছরই দুই ঈদে দেশের টেলিভিশন চ্যানেল গুলো ব্যাপক অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে। কারও ৭দিন, কারও ৫দিনের অনুষ্ঠান থাকে। ঈদে ৭দিন ব্যাপি অনুষ্ঠানমালার প্রচলন করে চ্যানেল আই। বর্তমান সময়ে অধিকাংশ টেলিভিশন চ্যানেলে ঈদের ৭দিন ব্যাপি অনুষ্ঠান মালার আয়োজন থাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। একটি সূত্রের খবর, এবারও ঈদে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে ৩শতাধিক নাটক, টেলিফিল্ম প্রচার হবে। ওটিটি প্লাটফর্মের হিসেব যুক্ত করলে এই সংখ্যা ৪শ ছাড়িয়ে যাবে। কাজেই আনন্দ আলোর পক্ষ থেকে অনুরোধ, এবারের ঈদে দেশের টেলিভিশন চ্যানেল গুলোর সঙ্গেই থাকুন।

চলুন হলে গিয়ে সিনেমা দেখি

সিনেমা এক সময় ঈদের আনন্দ উৎসবের অন্যতম অনুষজ্ঞ ছিল। পরিবারের লোকজন ঈদের নতুন সিনেমা দেখার জন্য দল বেধে সিনেমা হলে যেত। প্রতি ঈদে নতুন সিনেমা মুক্তির লড়াই শুরু হয়। এবারও মুক্তির মিছিলে একাধিক নতুন সিনেমাকে নাম শোনা যাচ্ছে। রোজার ঈদে তামিম নূর পরিচালিত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। এই ঈদে নতুন কোনো সিনেমার আলোচনা গুরুত্ব পাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। বিশেষ অনুরোধ হলে গিয়ে ঈদের সিনেমা দেখুন। তাহলে আশাকরি নতুন সিনেমা হল নির্মাণের ব্যাপারে হল মালিকদের কিছুটা হলেও বোধোদয় হবে। একথা সত্য, সিনেমা হলেই সিনেমাকে মানায়।

আমাদের গানের পৃথিবী

বাংলা গানের অনেক প্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে। একটা সময় ঈদের সময় নতুন গানের নতুন ক্যাসেট প্রকাশের হিড়িক পড়ে যেতো। পত্রিকার ঈদ সংখ্যা কেনার মতোই লাইন ধরে নতুন গানের ক্যাসেট কিনতেন শ্রোতারা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবে সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। কিন্তু গান তো হারায়নি। এই ঈদে আসুন না সবাই মিলে বাংলা গানের প্রতি যতœবান হই। প্রিয়জনকে বাংলা গান উপহার দেই। ঈদের উপহার হিসেবে সময়ের আলোচিত একটি বাংলা গানকে আপনি সহজেই গুরুত্বপুর্ন করে তুলতে পারেন।

ঈদের দিনের খাবার-দাবার

ঈদে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন পর্ব হলো রান্না বান্না। উৎসব মানেই আড্ডার পাশাপাশি ভালো খাবারের আয়োজন। ঈদ উৎসবে খাবারই বেশ গুরুত্বপুর্ন হয়ে ওঠে। ঈদুল ফিতরে সেমাই থাকা চাই-ই চাই। কুরবানীর ঈদে পোলাও মাংস গুরুত্বপুর্ন। ধনী, গরীব সবারই খাবার প্লেটে পোলাও মাংস জুটে যায় যার যার সাধ্য মতো। ঈদের দিন প্রতিবেশীর খোঁজ নিন। প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে ঈদের আনন্দ প্রকৃত আনন্দ ছড়ায় না।

বই হোক ঈদের সেরা উপহার

ঈদে আমরা প্রিয়জনকে উপহার দিতে ভালোবাসি। প্রিয়জনকে নতুন কাপড়, জামা, প্যান্ট, শাড়ি, সালোয়াড়, কামিজ দিতে ভালোবাসি। কুরবানীর ঈদে এই বিষয় গুলো তেমন গুরুত্ব পায় না। গুরুত্ব পায় পশু কুরবানী। তবে হ্যা, ঈদে প্রিয়জনের কাছে ঈদ কার্ড পাঠাাতে পারেন। প্রিয় কবি, লেখকের আলোচিত বই সংগ্রহ করে এক ব্যাগ বই উপহার দিতে পারেন। আনন্দ আলো সহ বিভিন্ন পত্রিকার ঈদ সংখ্যাও ঈদের উপহারের তালিকায় যুক্ত করতে পারেন।

এই ঈদে প্রাণ ভরে দেশটাকেই দেখুন

দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘরের বাহিরে দুই পা ফেলিয়া। সত্যি তো তাই। আমরা অনেকে নিজের জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখার সময় বের করতে পারিনা। কিন্তু সবার উচিৎ দর্শনীয় স্থান গুলো দেখা। এর ফলে জ্ঞান বাড়ে, মন প্রফুল্ল হয়। এবারের ঈদে নিজ জেলার দর্শনীয় স্থান গুলো দেখার কর্মসূচি নিতে পারেন। অনেকে বিদেশে যাবার জন্য হয়তো মনস্থির করে ফেলেছেন। তাদের উদ্দেশে ছোট্ট প্রশ্ন- কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে গিয়েছেন কখনও? কুয়াকাটা দেখেছেন? সিলেট অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় ঘুরেছেন? এই ঈদে বিদেশে না গিয়ে দেশটাকেই দেখুন না একবার।

খেলাধুলায় নয়া উদ্যোগ

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষার্থীদের শারিরীক ও মানসিক বিকাশ তরান্বিত করার জন্য খেলাধুলার প্রতি জোর দিয়েছেন। সুস্থ মন সুস্থ দেহের জন্য খেলাধুলার কোনো বিকল্প নাই। এই ঈদে আপনারা যারা শহর থেকে গ্রামে যান তারা ফুটবল অথবা ক্রিকেট প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে পারেন। কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দিতে পারেন। পাঠাগার আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়ার কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেন।

প্রত্যেকে আমরা পরের তরে

ঈদ মানে আনন্দ। ঈদ মানেই উৎসব। আনন্দ উৎসব একা জমে না। এজন্য মানুষের ভীড়ে মানুষকেই প্রয়োজন হয়। ঈদ উৎসব মানে ধনী, গরীবের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নাই। প্রত্যেকে আমরা পরের তরে এই মনোভাবই ঈদের অন্যতম শক্তি। কুরবানীর ঈদে এই শক্তিটাই আমাদেরকে অনুপ্রেরণা জোগায়।

এবারের ঈদ উৎসব প্রকৃত অর্থেই সবার জন্য কল্যাণ বয়ে আনুক। শুভ কামনা সকলের জন্য। ঈদ মুবারক।

আরও পড়ুন

লোড হচ্ছে...