Ad space

মুস্তাফা মনোয়ার শিল্পের মানুষ:ফরিদুর রেজা সাগর

প্রকাশ:
19

ক্যামেরা যখন তুলির মতো এখন এই কথাটা সহজেই বলা যায়। এখন সবার হাতেই একটি করে ক্যামেরা থাকে।

মোবাইল ফোনের কারণে এখন ছবি তোলা খুবই সহজ হয়ে গেছে। ছয় বছরের বাচ্চাও দারুণ করে ছবি তুলতে পারে। তেমনি করে সত্তর বছরের বৃদ্ধও ছবি তুলতে পারে। আর যারা মাঝ বয়সে খেলা করেন মোবাইল নিয়ে তারা ছবি তুলে সেই ছবিতে রং মিশিয়ে নানারকম রূপ দেন। ইচ্ছে করলে এখন ক্যামেরায় নানা ধরনের ছবি তুলে উপস্থাপন করা যায়। তুলি দিয়ে যেমন কোনো শিল্পী মনের মাধুরি মিশিয়ে রং দিয়ে ছবি আঁকেন তেমনি আমরা এখন ক্যামেরা দিয়ে সেটাই করে থাকি। কিন্তু একটা সময় এই ক্যামেরা ছিল না। এখনকার মতো যত্রতত্র ছবি তোলা যেতো না। তখন ফিল্ম ছিল। ছবি তুলে সেই ফিল্ম ওয়াশ করে রোদে শুকিয়ে ছবি বের করতে হতো। ব্যয়বহুলও ছিল। বিশেষ করে মুভি ক্যামেরার কথা যদি বলি তাহলে কথাটা আরও জটিল শোনাবে।

Image

সেগমেন্ট ক্যামেরা চালাতেন তারা পড়াশোনা করতেন ক্যামেরার উপরে। সেই ক্যামেরা চালানোর গল্প আমি আরেকদিন বলবো। আজকে শুধু টেলিভিশন প্রযুক্তির ক্যামেরার কথা বলবো। এখন যে ক্যামেরা আমরা দেখি তারচেয়ে সেই ক্যামেরাগুলো তিন চারগুণ বড় ছিল। ক্যামেরার সাথে অনেক বড় ক্যাবলও ছিল। ক্যামেরাম্যান যখন মুভ করতো তখন সেই ক্যাবল ধরার জন্য দুজন লোক লাগতো। তখন অবশ্য একটি শব্দ ছিল কম্পোজিশন। ছোট্ট ট্রাইপয়েডে ক্যামেরা ধরা হচ্ছে সেটার একটা কম্পোজিশন ছিল। ক্যামেরাম্যানরা কিভাবে শর্ট ধরবে সেটা নিয়ে নানান পরিকল্পনা হতো। এই ব্যাপারে সাহায্য করতেন যিনি শিল্প নির্দেশনা দিতেন। অর্থাৎ চিত্রশিল্পীর সাহায্য নেয়া হতো। এই সাহায্য নেয়ার সময়ে টেলিভিশনের আগের অনুষ্ঠানটি দেখতে হতো।  অনুষ্ঠান শেষে একটি লেখা যেতো দৃশ্য পরিকল্পনা ও শিল্প নির্দেশনা। অর্থাৎ যিনি শিল্প নির্দেনা দিয়েছেন তিনি

দৃশ্যও পরিকল্পনা করেছেন। কোনো অনুষ্ঠান করতে গেলে শিল্প নির্দেশক এবং প্রযোজকদের ভেতর একটি মিটিংও হতো। কিভাবে দৃশ্যায়ন করা হবে। সেই সময়ের বিশাল আকৃতির ক্যামেরাকে তুলির মতো ব্যবহার করেছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। এতবড় ক্যামেরা দিয়ে কিভাবে তিনি দৃশ্য পরিকল্পনা করতেন সেটাও ছিল বিস্ময়ের। সাদাকালো হওয়া সত্বেও সেইসব দৃশ্যকে গূণগ্রাহী করে তুলতে হতো।

মুস্তাফা মনোয়ারের তৈরি নানা রকম অনুষ্ঠান প্রচার হতো বিটিভিতে। এখনকার মতো সৃজনশীল কিছু না থাকা সত্বেও তিনি হাতের কাছে যা পেয়েছেন তাই দিয়েই সেটা তৈরি করেছেন। সেই সময়ে যখন ক্যামেরাকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নাড়াচাড়া করাও কষ্টকর ছিল। ছোটদের জন্য তিনি নিমা রহমানের পাঁচটি কবিতার চিত্রায়ণ  করেছেন।  একেকটি  কবিতা  একেকরকম।  প্রতিটি  কবিতা  আলাদাভাবে  দৃশ্যায়িত  করেছেন  মুস্তাফা মনোয়ার। টেলিভিশনে এত সুন্দর করে কবিতাকে উপস্থাপন করা যায়!

Image

কিন্তু সেটা তিনি করে দেখিয়েছেন। সেই একই কথা মনে পড়েÑক্যানভাসের মধ্যে শিল্পী ছবি আঁকছেন। আর ডিআইটির সেই ছোট্ট স্টুডিওতে তৈরি করা মুখরা রমণী বশীকরনের কথা তো আমিও লিখেছি অনেকেই এটার উদাহরণ দিয়েছেন। এখানে আমি আরেকটি উদাহরণ দিয়ে দিই। এত ছোট্ট স্টুডিওতে অনুষ্ঠান করা যে কত কষ্টের সেই সময়ে যারা এসব অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাদের সকলেরই এটা জানা। একবার একটি নাটকে দেখা গেল একটি ঢোলা পায়জামা একজন শিল্পী পরেছেন কিন্তু পায়জামাটা সেভাবে মানাচ্ছে না। তখন শুটিং হতো সারারাত ধরে। সেই ঢোলা পায়জামাকে কিভাবে

ছোট করে পরানো যাবে সেই ভাবনা শুরু হলো। আবার শুটিং বন্ধও করা যাবে না। মুস্তাফা মনোয়ার আরেকটি পায়জামা এনে সেটার পা কেটে আগেরটার সাথে জোড়া লাগিয়ে পরিয়ে দিলেন। কেউ বুঝতেই পারেনি কিভাবে কি হয়ে

গেল। সেই সাদাকালো আমলে তিনি ছোটদের বড়দের মিলিয়ে একটার পর একটা অনুষ্ঠান নির্মাণ করে সবাইকে তাক  লাগিয়ে  দিয়েছেন।  সেই  সময়কার  একটি  অনুষ্ঠান  ছিল  ঋতুর  রঙে  আঁকা।  জাপানের  একটি  পুরস্কার জিতেছিল  সেটি।  সেটাই  ছিল  আমাদের  দেশের  টেলিভিশনের  ইতিহাসে  প্রথম  আন্তর্জাতিক  পুরস্কার।


আমাদের দেশে ছয়ঋতুকে নিয়ে নাচের একটি অনুষ্ঠান ছিল। টেলিভিশনে কিভাবে নাচকে উপস্থাপন করা যায় সেটা ছিল বিস্ময়কর। নাচের ছন্দ তালকে ক্যামেরার সামনে উপস্থাপন করা ছিল শিল্পের বড় উদাহরণ। একেবারে একটি নতুন ধারা টেলিভিশনে উপস্থাপন করলেন মুস্তাফা মনোয়ার। তাই লিখতে যখন বলি রংতুলির জাদুকর, একই সাথে টেলিভিশনের জাদুকর, ক্যামেরার জাদুকরÑতাকে খুব একটা কম বলা হয় না। কারণ তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠানে কত ভাবে কিংবা কত সহজে শুধু মাত্র সুষ্ঠু পরিকল্পনা থাকলে যেকোনো সৃজনশীল অনুষ্ঠান নির্মাণ করা সম্ভব।

একবার তিনি একজন মানুষকে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে ক্লোজআপ শর্ট নিয়ে লাইটের খেলা দেখালেন। লাইট যদি এংগেল করে ধরা হয় তাহলে দেখা যাবে লোকটি একজন সদা হাস্যময় লোক। আবার লাইটটি যদি অন্য এংগেলে ধরে ক্যামেরা একটু অন্য এংগেলে ধরা হয় তাহলে বুঝা যাবে লোকটি ভিষণ রাগী। এই যে শুধুমাত্র আলোছায়ার খেলা দিয়ে মুস্তাফা মনোয়ার আমাদের মন জয় করে গেছেন সেটা কি কোনোদিন আমরা ভুলতে পারবো? 

Image

তিনি চলে যাবার কিছুদিন আগে আমাদের চ্যানেল আইতে এসেছিলেন। তিনি একটি ক্যানভাসে আর্ট কলম দিয়ে একটি ছবি এঁকে দিলেন। সেটি ছিল রবীন্দ্রনাথের একটি প্রোট্টেট। কয়েক মিনিটেই ক্যানভাসের সাদা পাতাটিতে  স্পষ্ট  হয়ে  উঠলো  রবীন্দ্রনাথের  অবয়ব।  তেমনি  আমার  চোখে  স্পষ্ট হয়ে  ভাসছে  মুস্তাফা  মনোয়ার মানেই বাঘা মিনির ¯্রষ্টা। মুস্তাফা মনোয়ার মানেই বাংলা টেলিভিশনে নতুন ধারার অনুষ্ঠান নির্মাতা। তিনি এমন কিছুই করে গেছেন। তাই তাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে চ্যানেল আই ভবনে আমরা একটি স্টুডিও তার নামে করেছি। এখন

যে মানুষটি টেলিভিশনের সঙ্গে যুক্ত হবেন তিনি অবশ্যই মুস্তাফা মনোয়ারকে স্মরণ করবেন।

শীর্ষ কাহিনী নিয়ে

লোড হচ্ছে...