
প্রাণ খোলা হাসি ছড়িয়ে তিনি আমাদেরকে স্বাগত জানালেন। এসএমসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সিইও তিনি। তসলিম উদ্দিন খান। এক নামেই যার ব্যাপক পরিচিতি। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে সোসাল মার্কেটিং কোম্পানী হিসেবে এসএমসি দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জন্ম নিয়ন্ত্রণ সহ সামাজিক নানা ক্ষেত্রে বহ বছর ধরে গুরুত্বপুর্ন অবদান রেখে চলেছে। মনি বিস্কুট এসএমসির একটি অন্যতম প্রডাক্টস। বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে চ্যানেল আই এর একটি অনুষ্ঠানে সহযোগি হিসেবে যুক্ত হয়েছে মনি বিস্কুট। সেই সুত্র ধরে আনন্দ আলোর মুখোমুখি হয়েছেন তসলিম উদ্দিন খান। সঙ্গে ছিলেন আনন্দ আলোর রেজানুর রহমান।
রেজানুর রহমান: শুরুতে এসএমসি প্রসঙ্গে একটু জানতে চাই। এর তো একটি বর্নাঢ্য ইতিহাস আছে...
তসলিম উদ্দিন খান: ১৯৭৫ সালে সোসাল মার্কেটিং কোম্পানী হিসেবে এসএমসির যাত্রা শুরু। মূলত: বিএসআই নামে একটা প্রজেক্টের অধীনে এর কর্মকান্ড শুরু হয়। দেশ স্বাধীনের পর বাংলাদেশের জনসংখ্যার উর্ধ্বগতি কিভাবে ঠেকানো যায় এই ব্যাপারেই মূলত: বিএসআই এর কাজের ফোকাস ছিল বেশী। দেশের জনসংখ্যা কিভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এব্যপারেই ক্যাম্পেইন শুরু করে বিএসআই এর নেতৃত্বে এসএমসি। প্রায় একদশক আমরা শুধুমাত্র পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে কাজ করতে থাকি। কিভাবে দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এই লক্ষ্যে আমরা রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্রে প্রচরণা কার্যক্রম চালাতে থাকি। পিল এবং কনডমের ব্যবহার নিয়ে জোর প্রচারনার পাশাপাশি জনসচেতনতার ব্যাপারটাকেও আমরা বিশেষ ভাবে গুরুত্ব দেই। রাজা এবং মায়ার কথা নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে। রাজা হল কনডম এবং মায়া হল বড়ি। দেশের মানুষের কাছে অনেক পপুলার হয়ে ওঠে এই দুটি ব্রান্ড। চিত্রনায়িকা রোজিনা একটি বিজ্ঞাপনে অংশ নিয়েছিলেন। এভাবেই এসএমসির কার্যক্রম এগিয়ে যেতে থাকে। আমরা এক সময় দেখলাম ডায়রিয়া জনিত রোগে শিশু মৃত্যুর হার বাড়ছে।
ডায়রিয়ার প্রকোপ কমাতে আমরা উদ্যোগী হই। শিশু মৃত্যুর হার কমাতে আমরা ওয়ারেছ ইনট্রুডিউচ করলাম। ব্যাপক ভাবে ওয়ারেছের প্রচারনা চালানো হল। ওয়ারেছ হল ওরাল রিহাইডেশন সলিউশন। উদ্বেগজনক খবর হল একসময় ডায়রিয়ার কারণে শিশু মৃত্যুর হার ছিল সবচেয়ে বেশী। প্রথম অবস্থানে ছিল। ওয়ারেছ এর প্রভাবে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। এখন অবস্থানটা ৮ম/৯ম এ দাঁড়িয়েছে। আমাদের ওয়ারেছের কার্যক্রমের ফলে মহান সৃষ্টিকর্তার রহমতে দেশের মিলিয়ন মিলিয়ন শিশুর জীবন রক্ষা হয়েছে।
ওয়ারেছের পরে আমরা বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু করলাম। শিশুদের নিউট্রিশনের জন্য আমরা এমএনপি অর্থাৎ মাইক্রো নিউট্রেন পাউডার বিতরণ শুরু করলাম। এটাকে আমরা মনি মিক্স পাউডারও বলে থাকি। শিশুদের স্বাস্থ্য সমস্যা বিশেষ করে পুস্টির ঘাটতি প্রতিরোধে মনি মিক্স পাউডার বেশ কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
রেজানুর রহমান: মনি মিক্স পাউডার কিভাবে সারাদেশে সরবরাহ করতেন?
তসলিম উদ্দিন খান: প্রথমে লোকাল ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানী সঙ্গে আমাদের এগ্রিমেন্ট ছিল। তারপরে আমরা ভালুকায় আমাদের নিজেদের ফার্মাসিউটিক্যাল এর মাধ্যমে মনি মিক্স পাউডারের প্রোডাকশন সারাদেশে সরবরাহ প্রক্রিয়া শুরু করি। এক পর্যায়ে আমরা নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সেনিটারী ন্যাপকিন এর প্রজেক্ট শুরু করি। গর্বের সঙ্গে বলতে পারি আমাদের এখন পণ্যের সংখ্যা ৬০ ছাড়িয়েছে। সব পন্যই গুণগত মানে সবার থেকে সেরা।
পথ চলতে চলতে আমরা আরও একটি যুগান্তকারী প্রডাক্ট শুরু করলাম। যার নাম- এসএমএস। মাল্টিপোল মাইক্রোনিউট্রেন সাপ্লিমেন্ট। এটি গর্ভবর্তী মায়েদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অনেক কার্যকর। গবেষণায় দেখা গেছে গর্ভবর্তী মায়েরা ১৫ ধরনের স্বাস্থ্য ঝুকিতে থাকে। আমাদের মাল্টিপোল, মাইক্রোনিউটেন সাপ্লিমেন্ট ১৫টি ঝুকি প্রতিরোধে বেশ কার্যকর। স্যানেটারি ন্যাপকিন বিষয়ক আমাদের একটি বিশেষ উদ্যোগ আছে। এটি বেশ সাশ্রয়ী এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশ আরামদায়ক। রুবাল এরিয়ায় আমাদের স্যানেটরি ন্যাপকিন বেশ জনপ্রিয়। ‘জয়া’ নামের এই স্যানেটারি ন্যাপকিন এখন নারীদের কাছে ব্যাপক আদৃত।
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যুগের চাহিদা সেটাতে এসএমসি বিভিন্ন সময়ে নতুন নতুন প্রডাক্ট বাজারে ছেড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আসে মনি বিস্কুট। এটি আগে পাউডার ছিল। খাবারের উপরে পাউডার ছিটিয়ে দিতে হতো। অনেক শিশু এটি অপছন্দ করতে শুরু করে। কারণ মনি মিক্স পাউডারের একটি নিজস্ব গন্ধ আছে। অনেক শিশুর এই গন্ধ পছন্দ নয়। তাই আমরা মনি মিক্স পাউডারের জায়গায় মনি বিস্কুট শুরু করলাম। মনি মিক্স পাউডারে যে পুস্টি আছে মনি বিস্কুটেও একই ধরনের পুস্টি আছে। কিন্তু শিশুরা বিস্কুটকেই পছন্দ করলো। মাত্র এক বছরের মধ্যে মনি বিস্কুট শিশুদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। মনি বিস্কুট এখন শিশুদেরই অনেক প্রিয় খাবার। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বেশ কার্যকর। বড়দের জন্যও মনি বিস্কুট আছে। সেটি হল মনি বিস্কুট প্লাস।
বিভিন্ন প্রডাক্টস এর বাইরেও আমাদের বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম আছে। দেশের ১৬১ উপজেলায় আমরা মেরামেডিক্স নিয়োগ দিয়েছি। তারা নিয়মিত গর্ভবর্তী মায়েদের সেবা দিচ্ছে। এটা আমরা এই কারণে করেছি যে, বাংলাদেশে একজন গর্ভবতী মাকে কমপক্ষে ৪টি এনসি সার্ভিস নিতে হয়। সবাই তা পায় না। প্রতিটি গর্ভবতী মায়ের অধিকার আছে তার প্রেগনেন্সি সেবা পাওয়ার। গর্ভবতী মা যদি প্রেগনেন্সি সেবা না পায় তাহলে তার গর্ভকালীন ঝুকি থেকে যায়। গর্ভকালীন ঝুকি যদি আইডেন্টিফাই না হয় তাহলে তো মাতৃমৃত্যুর হার বেড়ে যাবে

বাংলাদেশে মূলত: দুটি কারণে মাতৃ মৃত্যু হয়। একটা হল অধিক রক্তক্ষরণ, আরেকটি হল একলামশিয়া। এই দুটি কারণে শতকরা ৫৫ ভাগ গর্ভবতী মা মারা যায়।
আমরা বাচ্চাদের গ্রোথ মনিটরিং করি। এইযে এতক্ষণ নিউট্রেশনের কথা বললাম, যদি প্রতি মাসে চেকআপ করা যায় যে শিশুটি ম্যালনারিশ কি না, অথবা সিভিয়ার ম্যালনারিশ কিনা, তাহলে সেভাবে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। ব্লু স্টার নেটওয়ার্ক নামে আমাদের একটা নেটওয়ার্ক আছে। নন গ্রাজুয়েট মেডিকেল প্রাকটিশনাররা এখানে যুক্ত। রুবাল কমিউনিটিতে তাদের একটা করে ফার্মেসী আছে। সাথে একটা চেম্বার আছে। সেখানে তারা ইনজেকটেবল সার্ভিস দেয়? প্রেগনেন্সি কেয়ার সার্ভিস দেয়। গ্রথ মনিটরিং করে। তারা অন্যান্য সেবাও দেয়। এটাকে আমরা বলি হাতের কাছে মনের মতো সেবা। আমাদের এই ব্লু স্টাররা সারা বাংলাদেশে জালের মতো ছড়িয়ে আছে।
একটা গুরুত্বপুর্ন কথা বলি। এসএমসির যে প্রডাক্ট গুলো ব্যবসায়িক ভবে উপযোগী সেগুলোকে আমরা আলাদা করে এসএমসি এন্টারপ্রাইজ করেছি। এসএমসি এন্টারপ্রাইজের উদ্দেশ্য হল- তারা প্রফিট জেনারেট করবে। এসএমসিতে কারও কোনো মালিকানা নেই। এসএমসি ব্যক্তিমালিকানার কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। একটি বোর্ডের মাধ্যমে চলে। প্রফিটটা বোর্ডের কোনো মেম্বারের জন্য নয়। এসএমসির প্রফিট মানুষের কল্যানের জন্য ব্যয় করা হয়।
রেজানুর রহমান: এবার মনি বিস্কুট প্রসঙ্গে আসি। মনি বিস্কুট বিশ্বকাপ ফুটবলে ঢুকে গেল। এটি তো একটি চমকও বটে। এই ব্যাপারে কিছু বলুন।
তসলিম উদ্দিন খান: চ্যানেল আই এর কাছে আমরা আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। চ্যানেল আই সব সময় তাদের অনুষ্ঠানে উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনাকে গুরুত্ব দেয়। চ্যানেল আই সব সময় ভালোর সঙ্গে থাকে। চ্যানেল আই এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগরের সঙ্গে আমরা একটা মিটিং ছিল। ওই মিটিং নানা বিষয়ে কথা হচ্ছিলো। বিশেষ করে মনি বিস্কুট নিয়ে কথা ওঠে। মনি বিস্কুটকে কিভাবে আরও পপুলার করা যায় সেই ব্যাপারে সাগর ভাইয়ের পরামর্শ চাইছিলাম। তখন সাগর ভাই বলেন, আমরা চ্যানেল আইতে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে একটি ইভেন্ট করছি। আপনাদের মনি বিস্কুট এখানে অংশ নিতে পারে। বিশ্বকাপের খেলা নিয়ে আনন্দ করা হলো। সঙ্গে মনি বিস্কুট এবং শিশুদের স্বাস্থ্যরক্ষার কথা আলোচনা হলো। প্রস্তাবটা আমার পছন্দ হলো। কিন্তু জয়েন্টলি কিভাবে কাজটা করা যাবে তাই নিয়ে ভাবনা শুরু হলো। পরে সাগর ভাই ও সিরাজ ভাই (শাইখ সিরাজ) দু’জনের মাথা থেকে একটা উদ্ভাবনী আইডিয়া বের হলো। চ্যানেল আইতে একটি মাঠ হবে। মাঠে গোলপোস্ট থাকবে। অতিথি যারা আসবেন তারা গোলপোস্টে গোল দেওয়ার চেষ্টা করবেন। গাল করতে পারলেই তাকে মনি বিস্কুট উপহার দেওয়া হবে। এই যে একটা উদ্ভাবনী আইডিয়া, আমাকে দারুণ ভাবে মুগ্ধ করেছে। ভাবতে অবাক লাগে আমার রুমে বসে আমি, সাগর ভাই, আমাদের স্বপ্না আপা এবং আমাদের কলিগ মহিউদ্দিন সাহেব সহ আমরা মাত্র ৩০ মিনিটের আলোচনায় সিদ্ধান্ত নেই বিশ্বকাপের এই অনুষ্ঠানে চ্যানেল আই এর সঙ্গে মনি বিস্কুট থাকবে। আমরা খুবই আনন্দিত যে চ্যানেল আই আমাদেরকে সঙ্গে রেখেছে। প্রচুর ফিডব্যাক পাচ্ছি। প্রচুর প্রশংসা পাচ্ছি। ভেরি পজিটিভ। সাধারন মানুষের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। তারা মনি বিস্কুটকে চিনতে পারছে। এজন্য চ্যানেল আইকে আবারও ধন্যবাদ জানাই। সাগর ভাইয়ের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। শাইখ সিরাজ ভাইকেও ধন্যবাদ জানাই। আমাদের স্বপ্না আপাকেও ধন্যবাদ।
রেজানুর রহমান: ফুটবল ভালো বাসেন তো?
তসলিম উদ্দিন খান: অবশ্যই।
রেজানুর রহমান: বিশ্বকাপে আপনার দল কোনটা?
তসলিম উদ্দিন খান: (মৃদু হেসে) দেখেন ফুটবল পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। আমি ব্রাজিলের সমর্থক। কিন্তু আমি অপেক্ষায় আছি বাংলাদেশ কবে বিশ্বকাপ ফুটবলে জায়গা করে নিবে তা দেখার জন্য। সেদিন বোধকরি বেশী দূরে নয়। আমাদের যদি প্রত্যয় থাকে। প্রচেষ্টা থাকে তবে অবশ্যই বাংলাদেশ একদিন বিশ্বকাপ ফুটবলে জায়গা করে নিবে। আশা আছে বলেই মানুষ বাঁচে। সে কারণে আশায় আছি...





