
সৈয়দ বাড়ির মেয়ের এসব মানায় না

কেরাম প্রতিযোগিতায় ফাতেমা তুজ জোহরা প্রায়শই চ্যাম্পিয়ন হতেন। সাঁতার কাটা, সাইকেল চালানো ছিল তারা শখ... ‘ফিরে দেখা’ বিভাগে তারই গল্প তুলে ধলা হল...
জেনে খুশী হবেন, ছাত্রী জীবনে ফাতেমা-তুজ-জোহরা খুব ভালো এথলেট ছিলেন। শর্টপুট ও কেরাম প্রতিযোগিতায় প্রায়ই চ্যাম্পিয়ন হতেন। ছোটবেলায় তিনি এতটাই পাতলা গড়নের ছিলেন যে মনে হতো শর্টপুটের চাকতি নিক্ষেপের সাথে সাথে চাকতির আগে তিনি নিজেই ছুটে চলছেন। নদীতে সাঁতার কাটা ও সাইকেল চালানো ছিল তার শখ। সাইকেল চালাতে গিয়ে কতবার হাত, পা কেটে গেছে তার হিসাব নেই। বাড়িতে ফিরলে কাটা ঘায়ে নুনের ছিঁটের মতো-মা আচ্ছা করে মার দিতেন। মার দেবার সময় মায়ের মুখে একটা কথাই উচ্চারিত হতো, সৈয়দ বাড়ির মেয়ে সাইকেল চালিয়ে হাত কেটেছে শুনলে লোকে কী বলবে? ফাতেমা-তুজ-জোহরা কোনো জবাব দিতেন না। শুধু মার খেয়েই যেতেন।ছোটবেলায় মাছ ধরতেও বেশ পছন্দ করতেন। দাদা বাড়িতে গেলেই বাড়ির পাশের ডোবায় জামা কুঁচি দিয়ে দাড়িকানা মাছ ধরতে চলে যেতেন। মা পুরো বাড়ি খুঁজে একাকার। খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত মা যখন তাকে ডোবার পাড়ে খুঁজে পেতেন তখন সে কি মার দিতেন তা বলে বোঝানোর উপায় নেই। কিন্তু এতসব অভ্যেসকে ছাপিয়ে তিনি সবার কাছে পরিচিত হলেন একজন নজরুল সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে। নজরুলের লেখা অনেক গান তার কণ্ঠে নতুন করে প্রাণ পেয়েছে। বেশ কিছু অ্যালবাম শ্রোতা কর্তৃক প্রশংসিত হয়েছে। তার কণ্ঠে নজরুলের গানের প্রাণবন্ত উপস্থাপনার ব্যাপারটি বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। তাই তো দেশের পাশাপাশি বিদেশের মাটিতে নজরুল সঙ্গীতের অনেক শো’তে অংশ নিয়েছেন তিনি। এ যাবৎ তিনি ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশে শো করেছেন। তার কাছে নজরুল মানে জাতীয় চেতনার একটি অংশ। সেই সাথে তিনি এটাও মনে করেন প্রতিটি জাতি তাদের জাতীয় কবিকে আঁকড়ে ধরে গর্ব করতে পারেন। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর বিশেষ মাধ্যম হলো নজরুল সঙ্গীতকে ভালোবাসা। পরিবারে বাবা-মা সব সময় নজরুলপ্রেমী ছিলেন। বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণায় ছোটবেলা থেকেই নজরুল সঙ্গীতের ভক্ত হয়ে ওঠেন ফাতেমা-তুজ-জোহরা। ছোটবেলায় স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন নজরুল সঙ্গীতের মাধ্যমে। সব সময় হতেন প্রথম।পরিবারের ছেলেমেয়েদের সাথে সময় কাটানোর পাশাপাশি অবসরে লেখালেখি করতে পছন্দ করেন ফাতেমা-তুজ-জোহরা। লেখালেখিতে শিশুতোষ লেখাই প্রাধান্য পায়। লেখার উপজীব্য থাকে গান আর নজরুল প্রসঙ্গ। ছোটদের মনে নজরুল প্রেম জাগিয়ে তোলাই লেখার উদ্দেশ্য। তাই তো ছোটদের জন্য স্বরচিত ছড়ার মাঝে একটি ছড়া হলো এমনÑ
‘আমাদের প্রিয় কবি কাজী নজরুল
মাথাভরা ছিল তার একরাশ চুল।
শুধু ছড়া, কবিতা আর সঙ্গীতে নয়
বিদ্রোহী নামে তার বড় পরিচয়।’

অনেক সময় লেখায় উপন্যাস ও কবিতার বই প্রাধান্য পায়। অনেক সময় বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি করে থাকেন। এ ছাড়াও একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে তার রচিত কয়েকটি গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। গান করা ও লেখার পাশাপাশি গান নিয়ে সাজানো নানারকম অনুষ্ঠান উপস্থাপনাও করছেন তিনি। এ সকল কাজের মাঝেই বিনোদন খুঁজে ফেরেন ফাতেমা-তুজ-জোহরা। তার কাছে মনে আনন্দ আনে এমন সব কাজই বিনোদন। বিনোদনের একটা ভালো মাধ্যম গান। চলচ্চিত্র ও নাটক বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। সবকিছু ছাপিয়ে তার কাছে বড় বিনোদন হলো বন্ধুদের সাথে মজার আড্ডা। ফাতেমা-তুজ-জোহরার কাছে বন্ধুত্ব হলো শরীরের একটি অংশের মতো। যেখানে আঘাত লাগলে সমস্ত শরীরে ব্যথা লাগে। আর বন্ধুত্ব তার সাথেই হয় যার সাথে শেয়ার করার মতো সবকিছুই শেয়ার করা যায়। তার কাছে গানটা হলো সুরের খেলা। সুর একজন অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করে তুলতে পারে। কারণ মানুষ সুরের পাগল। গানের ক্ষেত্রে সবকিছু ছাড়িয়ে সুরের নেশায় মত্ত হওয়াই ভালো। ফাতেমা-তুজ-জোহরার ক্ষেত্রে হয়েছেও তাই।তিনি যেকোনো স্টেজ শো’তে অংশ নিতে গিয়ে অধিকাংশ সময় সাদা কাপড় পরে থাকেন। তার মতে, সাদা পোশাকেই নজরুলের গান উপস্থাপন করাটাই শ্রেয়। মনে করেন এ যেন নিজেকে ছাপিয়ে সুরকে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টারই নামান্তর।
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...








